নরসিংদীর খবর

বদলে যাচ্ছে মানুষ -ড.মশিউর রহমান মৃধা

The Daily Narsingdir Bani

পারফিউম ফ্যাক্টরি The Daily Narsingdir Bani

দু’জন মানুষ কখনো জীবনজগতকে একইভাবে দেখে না। প্রতিটি মানুষের আলাদা বৈশিষ্ট্য রয়েছে। প্রত্যেক মানুষের আলাদা অবস্থান থেকে বিশ্বকে দেখা, অনুভব করা, ঘটে যাওয়া ঘটনাসমূহের ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ করা, মানুষের ক্রিয়াকর্ম পর্যবেক্ষণ করার একটি নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি রয়েছে। এই ক্ষেত্রে পরিবেশ পরিস্থিতি যদি সংকটময় কিংবা ভীতিকর হয় তাহলে মানুষের আচরণে এর প্রভাব পড়বে। শারীরিক, মানসিক ও আর্থিক সমস্যা তৈরি হবে। এ সময় বিবেকহীন, আস্থাহীন, অর্থহীন, অনৈক্য ও অবিশ্বাসের সম্পর্ক তৈরি হবে, যা মানুষের জন্য অন্তর্ঘাতমূলক। মনীষীদের ভাষায় অস্থির ও সংকীর্ণ মানসিকতা স্বাস্থ্য এবং শান্তি দু’টোই বিনষ্ট করে। এরকম পরিস্থিতির অন্যতম একটি কারণ হচ্ছে মনুষ্য সৃষ্ট; অতৃপ্ত জটিল কঠিন অশান্ত জীবন, অন্যটি প্রকৃতি প্রদত্ত।

হাতি মার্কা সাবান হাতি মার্কা সাবান

বর্তমান কোভিড-১৯ তথা করোনা মহামারী পরিস্থিতি বিশ্বকে অস্থির অশান্ত ও অনিশ্চিত করে তুলেছে। মানুষ অস্বস্তি, হতাশা ও বিষণ্নতায় ডুবে যাচ্ছে। একদিকে কর্মহীন হয়ে পড়া, অধিক সময় পরিবারে অবস্থান করার কারণে বিরক্তিকর ও তিক্ত পরিবেশ তৈরি হওয়া, চাকরি হারানো, মস্তিষ্কের সঙ্গে অসংলগ্ন বোঝাপড়া, সূক্ষ্ম অনুভূতিতে অনিশ্চিত জীবন দেখা। ফলে ঝগড়া-বিবাদ, বিচ্ছেদ-বিরহ, হতাশা-বিষণ্ণতা মানুষকে অক্টোপাশের মত আকড়ে ধরছে। এ হেন পরিস্থিতি অতীত মানব প্রকৃতির সাথে সাংঘর্ষিক এবং একই সঙ্গে প্রচন্ড মানসিক চাপ থেকে নানা ঘটনার সূত্রপাত।

প্রথমত সংক্রমণ ভীতি; সংক্রমিত হলে সামাজিক বিচ্ছিন্নতার ভয়, পরিবার থেকে আলাদা থাকার ভয়, প্রয়োজনীয় চিকিৎসা প্রাপ্তির অনিশ্চয়তা সর্বোপরি মৃত্যু ভয় মানুষকে চূড়ান্ত মানসিক চাপে ফেলে দিয়েছে। জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের পরিসংখ্যান অনুযায়ী বিষণ্ণতা ও দুশ্চিন্তার হার বৃদ্ধি পেয়েছে তিনগুণ, আত্মহত্যার হারও বেড়েছে। ফলে উদ্বিগ্নতা, বুক ধরফর করা, শ্বাসকষ্ট, মাথা ব্যথা, দুর্বলতা অনুভব করা সহ যেকোন সময় যেকোন কিছু ঘটে যাবে বা মরে যাবো এমনটি মানুষকে অস্থির করে তুলেছে। খাওয়া-দাওয়ায় অরুচি, নিরানন্দ সময় অতিক্রম করা, কোন কিছুই ভাল না লাগা দিনে দিনে মানুষের অভ্যাসে পরিণত হয়ে যাচ্ছে। মেজাজ খিটখিটে হয়ে যাচ্ছে এবং আত্মকেন্দ্রিক জীবনযাপনের প্রবণতা বেড়ে যাচ্ছে। পরিণত মানুষদের জীবনের উপর আগ্রহ কমে যাচ্ছে। আবার কেউ কেউ বিষাদ-বিষণ্ণতায় ভুগে আগামীর স্বপ্ন থেকে নিজেকে দুরে সরিয়ে নিচ্ছে।

শিক্ষক হিসেবে লেখাটির মূল উপজীব্য বিষয়- শিশু কিশোর ও তরুণ, যারা আগামীর কর্ণধার। যাদের হাতে আগামী বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে। বর্তমান নাজুক পরিস্থিতির প্রভাব শিশু-কিশোর এবং তরুণদের উপর প্রচন্ডরকম লক্ষ করা যাচ্ছে। দীর্ঘদিন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ। কথায় আছে-‘মানুষ অভ্যাসের দাস’, ‘অনভ্যাসে বিদ্যা হ্রাস’। এই মুহূর্তে শিক্ষার্থীরা কি শিখছে? অনলাইন প্লাটফর্মগুলো ব্যবহারের মাধ্যমে কোথাও কোথাও বিচ্ছিন্নভাবে পাঠদান চলছে। কিন্তু ভার্চুয়াল ও ন্যাচারাল দু’টো সম্পূর্ণ আলাদা বিষয়। সেখানে বিস্তর পার্থক্য। এছাড়া মোবাইল ফোন বা ইন্টারনেট ব্যবহারে অপপ্রয়োগের মাত্রা তীব্র হচ্ছে। নেশার মতই অনলাইন আসক্তি বেড়ে যাচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীরা ভার্চুয়াল ক্লাসের নামে ফাকি দিচ্ছে বা অন্য কিছু শিখছে যা সমৃদ্ধ আগামীর পথে অন্তরায়।

শিশু-কিশোর ও তরুণদের জীবনযাত্রায় রুটিন পরিবর্তন হয়ে যাচ্ছে। জীবন সম্পর্কে তারা উদাসীন হয়ে পড়ছে। জীবন পুরোপুরি পরিচর্যার বিষয়। এই মুহূর্তে জীবনের পরিচর্যা নেই বললেই চলে। বর্তমান প্রজন্মের জীবন পরিচর্যার উপর আগামী বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে। অভিভাবকরা সন্তানদের ঘরে রাখার সর্বোচ্চ লড়াই করছে। তাতে তাদের আচরণজনিত সমস্যা আরো প্রকট হচ্ছে। অথবা অলস মস্তিষ্কে অপ্রয়োজনীয় ও কাল্পনিক বিষয় আশয় তাদের মস্তিষ্কে প্রবেশ করছে। এমতাবস্থায় বখে যাওয়া, বিকৃত চিন্তায় আবিষ্ট হয়ে পড়া সহজ হয়ে যাচ্ছে। শিক্ষার্থীরা মূল ধারা থেকে অর্থাৎ পাঠোভ্যাস থেকে দুরে সরে যাচ্ছে। এর সঙ্গে বাল্য বিবাহ, ইভটিজিংসহ নানা মানসিক সমস্যায় জর্জরিত হচ্ছে। আবার কোথাও কোথাও অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে বা নেশাগ্রস্ত হয়ে পড়ছে। প্রায়শ তারা নেতিবাচক সংবাদ, ঘটনা শুনছে এবং দেখছে। কখনো কখনো আতঙ্কের ঢেউ আসছে। তাদের সামনে আলোকিত ভবিষ্যৎ কুয়াশার চাদরে ঢাকা পড়ে যাচ্ছে। কোথাও স্বস্তি ও আনন্দ অনুভব করছে না।

বর্তমান প্রেক্ষাপট ও পরিস্থিতিতে ইতিবাচক লক্ষণ ক্ষীণ। এই ক্ষেত্রে মনোভাব ও মানসিকতায় দৃঢ়তা পোষণ করা জরুরি। প্রতিনিয়ত জীবনের অর্থ মর্মার্থের কথা মনে করতে হবে। এই ক্ষেত্রে শিশু কিশোর তরুণদের অনুধাবন ক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য নিয়মিত পরামর্শ এবং সঙ্গ দিতে হবে। তাদের বুঝাতে হবে স্কুল-কলেজ বন্ধ মানে জীবন থেমে যাওয়া নয় বরং এই অবসর সময়কে একটি সুযোগ হিসেবে দেখা যেতে পারে। ইচ্ছে করলেই এই অফুরন্ত সময়কে কার্যকরী অর্থে ব্যবহার করা যেতে পারে। সংশ্লিষ্ট ও দায়িত্বশীলদের এটাকে সুযোগ হিসেবে দেখার ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি করে দিতে হবে। খুব খেয়াল করে বুঝতে হবে আগামীতে জাতি মেধা শূন্য হয়ে পড়ছে কিনা। অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, সামাজিক সংকট যতটা বাড়ছে তার চেয়ে মেধা সংকট বড় হয়ে যাচ্ছে কিনা। শিক্ষক হিসেবে লক্ষ করছি শিক্ষাব্যবস্থা লন্ডভন্ড হয়ে পড়ছে। প্রায় সবকিছুই কমবেশি চলমান থাকছে শুধুমাত্র শিক্ষাব্যবস্থা স্থবির। এই বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ চূড়ান্ত উদাসীন। মাঝে মাঝে খাপছাড়া কিছু সিদ্ধান্তের কথা শোনা যাচ্ছে মাত্র।

মনে রাখা জরুরি বদলে যাচ্ছে মানুষ। সূক্ষ্ম অনুভূতি দিয়ে নিজের সঙ্গে কথা বলার এখনই যথার্থ সময়। নেতিবাচক মনোভাব স্থায়ী আসন নিলে সমৃদ্ধ আগামীর পরিবর্তে সংকটময় মেধা শূন্য জাতি সোনার বাংলার বোঝা হয়ে দাড়াবে। একই সঙ্গে পরিবর্তিত মানুষের কর্ম-চিন্তা-দর্শন-দৃষ্টিভঙ্গি দ্বারা আগামীর পরিস্থিতি আরো অস্থির হয়ে যেতে পারে।

লেখক: অধ্যক্ষ, নরসিংদী ইনডিপেনডেন্ট কলেজ ও সভাপতি, নকশিস।

Back to top button