নরসিংদী সদরনরসিংদীর খবর

হাজীপুর নাসির উদ্দিন মেমোরিয়াল হাইস্কুলের জমিক্রয় ও ভবন নির্মানে স্কুল ফাণ্ডের ৭২লক্ষ টাকা আত্মসাত, তদন্তে নেমেছে সিআইডি

The Daily Narsingdir Bani
হাজীপুর নাসির উদ্দিন মেমোরিয়াল হাইস্কুল

বাণী রিপোর্ট : নরসিংদীর শহরতলী হাজীপুর নাসির উদ্দিন মেমোরিয়াল হাইস্কুলের জমিক্রয় ও ভবন নির্মাণে স্কুল পরিচালনা কমিটির সদস্য, জমিদাতা, গ্রহিতা ও প্রধান শিক্ষক যোগসাজসিকভাবে ৭২লক্ষ টাকা আত্মসাতের চাঞ্চল্যকর অভিযোগ পাওয়া গেছে। এ ঘটনায় নরসিংদীর বিজ্ঞ চীফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে মামলা দায়ের করা হলে অর্থ আত্মসাতকারীদের বিরুদ্ধে তদন্তে নেমেছে সিআইডি পুলিশ। অর্থ আত্মসাতের ঘটনায় থলের বিড়াল বেড়িয়ে আসবে বলে মনে করেন স্থানীয় লোকজন ও শিক্ষার্থীদের অভিভাবকগণ। এ নিয়ে এলাকার সর্বমহলে আলোচনা ও সমালোচনার ঝড় বইছে। অর্থ আত্মসাতকারীদের মুখোশ উন্মোচন ও তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবীতে সোচ্চার হয়েছে এলাকার সর্বস্তরের লোকজন।

পারফিউম ফ্যাক্টরি The Daily Narsingdir Bani

মামলার আসামীরা হলো স্কুলের বর্তমান ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি মোঃ মনিরুজ্জামান খান, প্রধান শিক্ষক তাপস কুমার ঢালি, সহ-সভাপতি ও হাজীপুর ইউপি চেয়ারম্যান ইউসুফ খান পিন্টু, স্কুল কমিটির সদস্য ও দলিল লিখক ফারুক আহমেদ, লুৎফর রহমান হিরু, জমি বিক্রেতা মোঃ শহিদ মিয়া, মোঃ ফরিদ মিয়া, মোসা: জোসনা বেগমসহ ৯জন।

হাতি মার্কা সাবান হাতি মার্কা সাবান

স্কুল ফাণ্ডের টাকা আত্মসাত করায় আদালতে মামলা দায়ের করেছেন, সমাজ সেবক, হাজীপুর ইউপি’র সাবেক প্যানেল ও ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান এবং বিদ্যালয়ের দুই দুই বারের নির্বাচিত ম্যানেজিং কমিটির সদস্য সুজিত সূত্রধর । জনস্বার্থে তিনি এ মামলা দায়ের করেছেন বলে জানান।

মামলার সূত্রে জানা যায়, হাজীপুর নাসির উদ্দিন মেমোরিয়াল হাইস্কুল ফাণ্ডের ৪২ লক্ষ টাকা ব্যয়ে স্কুল সংলগ্ন  টিনসেড বিল্ডিংসহ ১০ শতাংশ জমি ক্রয়ের জন্য জমির মালিক মোঃ শহিদ মিয়া গংদের সাথে চুক্তি করা হয়। জায়গার মূল্যবাবদ ৪২লাখ টাকা স্কুল ফান্ড থেকে পরিশোধ করার পর স্কুল কমিটির সভাপতি মনিরুজ্জামান খান আসামীদের যোগসাজসে স্কুলের নামে জায়গা সাব-কবলা রেজিষ্ট্রি না করে জালিয়াতির মাধ্যমে নিজের নামে উক্ত জায়গার একটি পাওয়ার অব এটর্নি দলিল সৃজন করে। পরে এক বছর পর ২৩মার্চ ২০১৭সালে উক্ত জমি মনিরুজ্জামান খান অন্যত্র সাব-কবলা দলিল মূলে বিক্রি করে দেয়। এসব দলিলের রেজিষ্ট্রি খরচ বাবদ আরো ১০ লক্ষ টাকা স্কুল ফাণ্ড থেকে উঠিয়ে আত্মসাত করেন। পরে স্কুলের একটি টিনসেড বিল্ডিং নির্মাণ ব্যায় বাবদ আরো ২০ লক্ষ টাকাসহ মোট ৭২লক্ষ টাকা জালজালিয়াতির মাধ্যমে আত্মসাত করেন। বর্তমানে এ টিনসেড বিল্ডিং এর কোন অস্তিত্ব খুজে পাওয়া যাবেনা।

মামলার বাদী সুজিত সূত্রধর জানান, এ স্কুলে যারা শিক্ষার্থী তাদের শতকরা আশি ভাগ অভিভাবক নিন্ম আয়ের মানুষ। কামার, কুমার, জেলে, দিনমজুর ও সমাজের নিন্ম আয়ের মানুষ অতি কষ্টে অর্জিত টাকায় সন্তানের লেখা-পড়ার খরচ নির্বাহ করেন। গরীব শিক্ষার্থীদের বেতন ও আনুষাঙ্গিক চার্জ স্কুল ফান্ডে জমা হয়। অথচ এসব টাকা স্কুল কমিটির লোকজন যোগসাজসিকভাবে আত্মসাত করে শিক্ষার্থী ও তাদের অভিভাবকদের রক্তচুষে খেয়েছে। জনস্বার্থে আমি এ মামলা দায়ের করেছি। আশা করি সিআইডির তদন্তে আত্মসাতকারীদের মুখোশ উন্মোচন হবে এবং আদালত থেকে জনগণ ন্যায় বিচার পাবেন।

হাজীপুর নাসির উদ্দিন মেমোরিয়াল স্কুলের সাবেক প্রধান শিক্ষক ও বর্তমানে নরসিংদী পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক সামসুল আলম বলেন, আমি স্কুলের দায়িত্বে থাকা অবস্থায় জমিক্রয় বাবদ ৪২লক্ষ টাকা রফাদফা করে বিভিন্ন সময়ে স্কুল ফান্ড থেকে উত্তরা ব্যাংকের চেকের মাধ্যমে ৩০ লাখ ৫০হাজার টাকা জমির মালিককে পরিশোধ করি। আমি থাকাকালীন সম্পূর্ণ টাকা পরিশোধ না হওয়ায় জমি রেজিষ্ট্রি হয়নি।

হাজীপুর নাসির উদ্দিন মেমোরিয়াল স্কুলের বর্তমান প্রধান শিক্ষক, তাপস কুমার ঢালি এর নিকট এ ব্যপারে জানতে চাইলে তিনি বলেন, মামলার বাদী ও সিআইডির সাথে যোগাযোগ করুণ।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে ম্যানেজিং কমিটির একজন সদস্য জানান, স্কুল ফান্ডের কোন টাকা আত্মসাত হয়নি। খারিজের জটিলতার কারনে জমি রেজিষ্ট্রি করতে দেরী হয়েছে। সিস্টেম লস হয়েছে তবে স্কুলের নামে পরবর্তীতে জমি ক্রয় করা হয়েছে।

জমি বিক্রেতা শহিদ মিয়া বলেন, জমিটি স্থানীয় মতিন মিয়ার নিকট বিক্রি করার কথা ছিল। পরে স্কুল কমিটির লোকজন জমি কিনতে আগ্রহ প্রকাশ করলে আমি বিক্রি করতে রাজি হই। স্কুল কতৃপক্ষ প্রায় দেড় বছরে দফায় দফায় জমির মূল্য বাবদ ৪২ লাখ টাকা পরিশোধ করে। টাকা পরিশোধের পর তারিখ অনুযায়ী আমরা জমিদাতাগণ রেজিষ্ট্রি অফিসে গিয়ে দলিলে স্বাক্ষর করে আসি। কী ধরনের দলিল করা হয়েছে আমরা জানিনা। মামলা হওয়ার পর জানতে পেরেছি আমরা স্কুলের সভাপতি মনিরুজ্জামান খানের নামে পাওয়ার দলিল রেজিষ্ট্রি করেছি। আমার ফাসিঁ হলেও আমি সত্য কথা বলবো। আমরা জানি স্কুল থেকে টাকা নিয়ে স্কুলের নামে জায়গা রেজিষ্ট্রি করে দিয়েছি।

স্থানীয় বয়স্ক ব্যক্তিগণ জানান, ১৯৮৮ সালে হাজীপুর ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে চেয়ারম্যান পদে প্রতিদ্বন্দ্বীতা করেন জালাল মাস্টার, নূরুল ইসলাম ও মনিরুজ্জামান খান এর পিতা মোঃ আবু তাহের মিয়া (তাবু মিয়া)। উক্ত নির্বাচনে হাজীপুর সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রের ভোটগ্রহন স্থগিত করা হয়। পরে আবু তাহের মিয়া এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তিদেরকে ডেকে সভা করে একটি হাইস্কুলের জন্য জায়গা দান করবেন বলে ঘোষণা দেন। তিনি ওই সভায় সকলের উপস্থিতিতে একই এলাকার চেয়াম্যান পদে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী মোঃ নূরুল ইসলামকে নির্বাচন থেকে সরে দাড়ানোসহ তাকে সমর্থন দেয়ার আহবান জানান। এ আশ্বাসে এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তি কমর উদ্দিন মুন্সী, এম এ খালেক, কমর মিয়া, ওমর সরকার ও  এলাকার আরো গণ্যমান্য ব্যক্তিগণ এলাকায় একটি হাইস্কুল প্রতিষ্ঠার স্বার্থে নূরুল ইসলাম মিয়াকে নির্বাচন থেকে সরে দাড়ানোর জন্য প্রস্তাব করেন। নূরুল ইসলাম স্থানীয় স্বার্থে জনগণের আহবানে সাড়া দিয়ে আবু তাহের মিয়াকে সমর্থন দিয়ে নির্বাচন থেকে সরে দাড়ালে ওই নির্বাচনে আবু তাহের মিয়া চেয়ারম্যান পদে বিপুল ভোটে নির্বাচিত হন। চেয়ারম্যান নির্বাচিত হওয়ার পর আবু তাহের মিয়া স্কুলের জন্য প্রতিশ্রুত জায়গাটি স্কুল প্রতিষ্ঠার জন্য না দিয়ে নরসিংদী চরাঞ্চলের জনৈক নূর মোহাম্মদের নিকট বিক্রি করে দেন। নূর মোহাম্মদ এ জায়গায় পাওয়ারলূম ফ্যক্টরি স্থাপন করেন এবং পরে এ জায়গাটি স্থানীয় এম এ খালেক এর নিকট বিক্রি করে দেন। বর্তমানে এ জায়গাটি খালেক সাহেব এর পাওয়ারলুম হিসেবে পরিচিত।

পরে স্থানীয় গণমান্য ব্যক্তিদের সমালোচনা ও চাপেঁর মুখে চেয়ারম্যান আবু তাহের এলাকাবাসী ও পাওয়ারলুম ব্যবসায়ীদের সহযোগীতায় বর্তমান হাজীপুর নাসির উদ্দিন মেমোরিয়াল হাইস্কুলের জায়গা ক্রয় করে ১৯৯৬সালে সেখানে স্কুল প্রতিষ্ঠা করেন। স্কুল প্রতিষ্ঠার পর এমপিও ভু্ক্তির পূর্ব পর্যন্ত দীর্ঘ সময় এলাকার গণ্যমান্য লোকজন বিশেষ করে হাজীপুরের পাওয়ারলুম ফ্যাক্টরির মালিকগণ চাদাঁ দিয়ে স্কুলের যাবতীয় খরচ নির্বাহ করতেন। প্রতিষ্ঠার পর থেকে চেয়ারম্যান আবু তাহের এর পরিবারের লোকজন স্কুলের পরিচালনার দায়িত্ব পালন করে আসছেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published.

Back to top button