নরসিংদীর খবরনরসিংদী সদর

নরসিংদী সিভিল সার্জন অফিসের কর্মচারী কালাম ছারোয়ার বুলবুল দম্পতির নামে-বেনামে রয়েছে কোটি কোটি টাকার অবৈধ সম্পদ

শেয়ার করুনঃ
The Daily Narsingdir Bani
কালাম ছারোয়ার বুলবুল তার ফেসবুক আইডি থেকে সংগৃহীত ছবি

বাণী রিপোর্ট : একজন সাধারণ কর্মচারী হয়ে প্রচুর বিত্ত বৈভবের মালিক, নরসিংদী সিভিল সার্জন অফিসের কালাম ছারোয়ার বুলবুল দম্পতি। নরসিংদী শহরে ও ঢাকায়িএ দম্পতির নামে-বেনামে রয়েছে কোটি কোটি টাকার অবৈধ সম্পদ। নরসিংদী জেলা স্বাস্থ্য বিভাগের প্রভাবশালী ব্যক্তি হিসেবে নিজেকে জাহির করে সম্পূর্ণ অবৈধভাবে হাতিয়ে নিচ্ছেন লক্ষ লক্ষ টাকা। সাধারণ সরকারী কর্মচারী হিসেবে দুর্মূল্যের বাজারে সংসার চালাতে যেখানে হিমসিম খাওয়ার কথা সেখানে তার বিলাসবহুল বাড়ী-গাড়ী ও প্রচুর অর্থ সম্পদের মালিক হওয়া নিয়ে নরসিংদী স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মকর্তা কর্মচারীদের মনে প্রশ্ন জেগেছে। একই প্রশ্নের উদ্রেগ হয়েছে নরসিংদীর সচেতন মহলের মাঝেও।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, নিন্মমান সহকারী হিসেব কালাম ছারোয়ার বুলবুল প্রথমে স্বাস্থ্য বিভাগে যোগদান করেন। পরবর্তীতে নিয়ম বহির্ভূতভাবে তিনি ষ্টেনো টাইপিষ্ট পদে নিয়োগপ্রাপ্ত হয়ে উচ্চতর স্কেলে বেতন-ভাতা ভোগ করছেন। তার ষ্টেনো টাইপিষ্ট পদে নিয়োগের সময় বিজ্ঞপ্তি প্রচার করা হলে মাত্র ৫জন প্রার্থী উক্ত পদে আবেদন করেন। দুইজন প্রার্থী লিখিত পরীক্ষায় অংশগ্রহন করেন। দু’জন প্রার্থীর কেউ প্রাকটিক্যাল পরীক্ষায় উর্ত্তীর্ণ হতে পারেনি। সরকারী নিয়মানুযায়ী উপযুক্ত প্রার্থী পাওয়া না গেলে পরবর্তীতে পুনরায় নিয়োগ বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে যথাযথ নিয়মে প্রার্থী নির্বাচন করতে হবে। তৎকালীন অসাধু সিভিল সার্জন নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে রেজুলেশনের মাধ্যমে কালাম ছারোয়ার বুলবুল কে নিন্মপদ থেকে উচ্চতর বেতন স্কেলে নিয়োগ দিয়ে সরকারের লক্ষ লক্ষ টাকা হাতিয়ে নেয়ার সুযোগ করে দিয়েছেন। এতে বঞ্চিত হয়েছেন যোগ্য প্রার্থীগণ। এ বিষয়ে কালাম ছারোয়ারের নিয়োগ সংক্রান্ত ফাইলটি তলব করে তদন্ত করলে এর সত্যতা পাওয়া যাবে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

The Daily Narsingdir Bani
কালাম ছারোয়ার বুলবুল দম্পতির বাড়ী

নরসিংদী স্বাস্থ্য বিভাগের প্রভাবশালী ব্যক্তি হওয়ায় তাকে অন্যত্র বদলী করা হলেও সেখানে তাকে কাজ করতে হয়নি। যখন যে সরকার থাকে তখন তিনি নিজেকে সে দলের কর্মী পরিচয় দিয়ে থাকেন। বর্তমান সরকারের আমলে তিনি নিজেকে যুবলীগ নেতা পরিচয় দিয়ে থাকেন। ক্ষমতাসীন দলের  প্রভাবশালী ব্যক্তিদের ব্যবহার করে পুনরায় তিনি নরসিংদী সিভিল সার্জন অফিসে ফিরে এসেছেন। ২০০৩ সালের ১৭ জুলাই কালাম ছারোয়ার বুলবুল কে শেরপুর সিভিল সার্জন অফিসে বদলী করা হয়। ওই সময়ে নরসিংদীর কথা নামের একটি পত্রিকায় সংবাদের শিরোনাম ছিল “নরসিংদী সিভিল সার্জন অফিসের দুর্নীতির মূল নায়কের বদলী”। নানা দুর্নীতি ও অপকর্মের সংবাদ পত্রিকায় ছাপা হলে কর্তৃপক্ষ তাকে বদলী করেন। তখন তিনি নিজেকে বিএনপি কর্মী  পরিচয় দিয়ে প্রভাবশালী বিএনপি নেতাদের ব্যবহার করে পুনরায় সে নরসিংদী ফিরে আসে। সেই থেকে চলছে তার দুর্নীতির রাজত্ব। ২০১৮ সালে কালাম সারোয়ার বুলবুলকে শরিয়তপুর সিভিল সার্জন কার্যালয়ে বদলী করা হয়। এ সময় সাপ্তাহিক অরুণিমা পত্রিকায় সংবাদের শিরোনাম ছিল “নরসিংদী সিভিল সার্জন অফিসের ষ্টেনো টাইপিষ্ট বুলবুল অন্যত্র বদলী”। সংবাদে উল্লেখ করা হয় “বুলবুল আহমেদের বিরুদ্ধে জেলা স্বস্থ্য বিভাগে বিভিন্ন অনিয়ম দুর্নীতির অভিযোগসহ তার দাপটের কারণে স্বাস্থ্য বিভাগের অন্যান্য কর্মকর্তা কর্মচারীরা তটস্থ ছিলেন। তার এ বদলীর ফলে সিভিল সার্জন কার্যালয়সহ জেলার স্বাস্থ্য বিভাগের বিভিন্ন স্তরের কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের মধ্যে স্বস্তি ফিরে এসেছে । আরো উল্লেখ করা হয় বুলবুল নতুন কর্মস্থলে যোগদান না করে হাইকোর্ট ডিভিশনের প্রশাসনিক ট্রাইব্যুনাল-১ এ বদলী সংক্রান্ত বিষয়ে তার উর্দ্ধতন কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে একটি মামলা দায়ের করেছেন। মামলায় ৬মাসের স্থগিত আদেশ নিয়ে বদলী ঠেকিয়েছেন। মামলার মাধ্যমে বুলবুল নরসিংদী সিভিল সার্জন অফিসে বহাল তবিয়তে রয়েছেন। বারবার বদলী ফিরিয়ে নরসিংদী আসায় সাধারণ কর্মকর্তা-কর্মচারীরা তার দাপটের কাছে অসহায় হয়ে পড়েছে।

কালাম ছারোয়ার বুলবুল দম্পতির নরসিংদী ও ঢাকায় রয়েছে নামে বেনামে কোটি কোটি টাকার সম্পদ। নরসিংদী শহরের বিলাসদী মহল্লায় ৪তলা বিশিষ্ট বিলাসবহুল বাড়ী, নরসিংদী শহরের প্রাণকেন্দ্র নরসিংদী পৌরসভার পার্শ্বে অবস্থিত নদী বাংলা গ্রুপের নির্মাণাধীন মার্কেটে কোটি টাকা ব্যয়ে দোকান ক্রয়, চিনিশপুর তিতাস গ্যাস অফিসের পাশে ১০ শতাংশ বাড়ীর ভূমি,  রাজধানীর মাতুয়াইলে ১০শতাংশ বাড়ী, ৩৫লক্ষ টাকা মূল্যমানের এফ প্রিমিউ ব্রান্ডের গাড়ী, বিভিন্ন বেসরকারী ডায়ানোস্টিক সেন্টার ও ক্লিনিকের ব্যবসা। এ দম্পতির নামে-বেনামে অঢেল টাকার সম্পদ, তদন্ত করলে এসবের সত্যতা মিলবে।

নরসিংদী জেলার বে-সরকারী ক্লিনিক ও ডায়ানোস্টিক সেন্টারের মালিকরা কালাম ছারোয়ারের কাছে জিম্মি হয়ে রয়েছে। লাইসেন্সের অনলাইন আবেদনের নামে তাদের কাছ থেকে আদায় করা হচ্ছে মোটা অংকের টাকা। ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ভয়ে কেউ মুখ খুলতে পারছেনা। সরকারীভাবে ক্লিনিক ও ডায়ানোস্টিক সেন্টারের লাইসেন্স সংক্রান্ত অনলাইন আবেদনের কার্যক্রম সম্পন্ন করার জন্য নরসিংদী সিভিল সার্জন কার্যালয় নির্দিষ্ট ২জন কর্মচারীকে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর হতে ট্রেনিং করিয়ে আনেন। কিন্ত প্রভাবশালী বুলবুল তাদের দিয়ে লাইসেন্সের কাজ না করিয়ে তার ব্যবহৃত অফিসিয়াল কম্পিউটার থেকে সে নিজে ক্লিনিক ও ডায়াগনোস্টিক সেন্টারের মালিকদের জিম্মি করে মোটা অংকের টাকা হাতিয়ে নিয়ে লাইসেন্সের কাজ করছেন।

নরসিংদী সিভিল সার্জন কার্যালয়ে কর্মস্থল হলেও বুলবুলকে অফিস সময়ে দেখা যায় নরসিংদী জেলা হাসপাতালের মহিলা হিসাব রক্ষকের কক্ষে। অফিস সময়ের পরও রাত পর্যন্ত জেলা হাসপাতালের হিসাব রক্ষকের কক্ষে তাকে নিয়মিত দেখা যায়। অফিসার না হয়েও সেখানে কর্মরত কর্মকর্তা কর্মচারীদের তিনি তার নির্দেশনা অনুযায়ী কাজের হুকুম করে থাকেন। নানা বিষয়ে হস্তক্ষেপ করে থাকেন ও  ভয়ভীতি দেখান। এতে অতিষ্ট হয়ে পড়েছে কর্মকর্তা কর্মচারীরা।

নারীলোভী কালাম ছারোয়ার বুলবুল। নারীদের প্রতি তার রয়েছে বিশেষ আবেগ। জেলার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে নারীরা সিভিল সার্জন অফিসে কাজের জন্য এলে নানা অজুহাতে তাদের কাজ প্রলম্বিত করে তার পাশের চেয়ারে বসিয়ে রেখে নানা আলাপচারিতায় লিপ্ত হয়। মেডিক্যাল ফিটনেস এর জন্য তাকে অতিরিক্ত টাকা দিতে হয়। নারী আসক্তির কারণে তিনি তিনটি বিবাহ করেন। ২০১৪ সালে নরসিংদী সদর হাসপাতালে বদলী হয়ে আসা সুন্দরী নার্স তার কুনজরে পড়ে। বিভিন্ন সময় কু প্রস্তাবে রাজী না হওয়ায় তাকে হয়রানী করা হয়। কুপ্রস্তাবের বিষয়ে বুলবুলের বিরুদ্ধে স্টাফ নার্স নীলা ও তার স্বামী স্বপন নরসিংদী সিভিল সার্জনসহ স্বাস্থ্য বিভাগের উর্দ্ধতন কর্তৃপক্ষের নিকট লিখিত অভিযোগ করেন। পরে তার তদন্ত হয়। এসময় স্বপন ও তার স্ত্রীকে প্রাণ নাশের হুমকী দেয়ায় কালাম ছারোয়ার বুলবুলের বিরুদ্ধে নরসিংদী মডেল থানায় ৩টি জিডি করা হয়। বিভাগীয় তদন্তের পরদিন ২০নভেম্বর/১৪ সালে স্টাফ নার্স নীলার স্বামী স্বপনকে তার বাড়ীর পাশে দুর্বৃত্তরা কুপিয়ে হত্যা করে। হত্যার ঘটনায় পুলিশের সন্দেহের তালিকায় ছিল বুলবুল। তৎসময়ে গণমাধ্যমে এসব বিষয়ে সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে।

নানা অপকর্মের পরও সিভিল সার্জ অফিসে বহাল তবিয়তে রয়েছে কালাম সারোয়ার। তার বিরুদ্ধে অপকর্ম ও দুর্নীতির অভিযোগ থাকা সত্বেও কেউ মুখ খুলতে সাহস পায়না।কর্মকর্তা কর্মচারীদের তিনি নানা বিষয়ে ভয়ভীতি দেখিয়ে থাকেন।

এসব অভিযোগ ও অপকর্মের বিষয়ে কালাম ছারোয়ার বুলবুলের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, অভিযোগগুলো মিথ্যা ভিত্তিহীন ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। আমার নামে কোন সম্পদ নেই। ব্যাংক একাউন্টে কোন টাকা নেই। গাড়ী নেই । কোন অপকর্মের সাথে জড়িত নই। একাধিক বিয়ে করিনি। যে বাড়ীতে বসবাস করি সে ৪তলা বাড়িটি আমার স্ত্রীর নামে। স্ত্রী বিদেশে চাকুরী করে অনেক টাকা বেতন পেতো, সেই টাকায় বাড়ীটি করা হয়েছে। বাংলাদেশে কোথাও আমার নামে সম্পদ নেই।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button