সম্পাদকীয়

বিশ্ব ইতিহাসের জঘন্যতম ও ঘৃণিত হত্যাকান্ড ১৫ আগস্টের কিছু কথা-

প্রিন্সিপাল এম, হানিফা

শেয়ার করুনঃ

The Daily Narsingdir Bani১৯৭১ সালের পরাজিত শক্তি ও ক্ষমতালোভী, বাংলাদেশের স্বাধীনতা বিরোধী শক্তি ও বিপথগামী সেনা অফিসারদের ও দেশি-বিদেশিদের হীন ষড়যন্ত্রের বহি: প্রকাশ-ই হলো ১৫ আগষ্টের হত্যাযজ্ঞের মূল কারণ। ১৯৭৫ সালের এই ১৫ আগস্ট ছিল শুক্রবার দিবাগত রাত ফজরের আযানের মুহূর্ত ধানমন্ডি ৩২ নম্বর সড়কে হঠাৎ যেন সামরিক মহড়া শুরু হলো। সামরিক জীপ, ট্যাঙ্ক, ট্রাক এদিক ওদিক বেপরোয়া ছুটাছুটি আর গুলির শব্দে পুরো ধানমন্ডি যেন কেঁপে উঠল যা ১৯৭১ এর কালো রাতের মতোই মনে হচ্ছিল। ঘাতকেরা প্রথমেই ৩২ নম্বর বাড়িটি চারদিক থেকে ঘিরে ফেলে এবং নিরাপত্তা রক্ষীদের জিম্মি করে ফেলে এবং এক পর্যায়ে জাতির জনকের প্রধান নিরাপত্তা কর্মকর্তা কর্নেল জামিলকে রাস্তার উপরেই গুলিকরে হত্যা করা হয়। গুলির শব্দে বাড়ির সবাই জেগে উঠেন।

জাতির জনক টেলিফোন করার চেষ্টা করেছেন এবং বড় ছেলে শেখ কামাল ঘুম ঘুম চোখে নিচে অফিস ঘরের এখানে এলে তাকে প্রথমে গুলি করে হত্যা করা হয়। তারপর তারা নীচতলার প্রতিটি কক্ষে ঢুকে গুলি চালাতে থাকে। প্রতিটি কক্ষের ফার্নিচার, ছবি এমনকি আলমারিতে পর্যন্ত গুলি চালাতে থাকে, যার চিহ্ন এখনো দর্শনার্থীদের মনে ব্যথা দিয়ে থাকে। নীচতলার লাইব্রেরির পামের কক্ষে আবস্থানরত জাতির জনকের ছোট ভাই শেখ নাসের কে হত্যা করার পর রান্না ঘর ও খাবার ঘরে ঢুকে ভয়ে কাঁদতে থাকা কাজের লোকদের কাছে গেল এবং এরই মধ্যে একদল ঘাতক দু’তলায় সিঁড়ির দ্বিতীয় ধাপে দাঁড়িয়ে দেখলো জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান লুঙ্গি ও সাদা পাঞ্জাবি পড়ে দাঁড়িয়ে প্রশ্ন করছেন এত গুলি কেন? কি হয়েছে? তোমদের অফিসার কোথায়? তখন তাদের একজন বলল স্যার, আপনাকে আমাদের সাথে যেতে হবে। বঙ্গবন্ধু পাল্টা প্রশ্ন করলেন, কেন? কোথায় যেতে হবে? ঠিক এই মুহূর্তে এই সেনাকে পেছন থেকে টান দিয়ে সরিয়ে একজন বেঈমান সেনা স্বপ্ন পুরুষ বিশ্ব নেতা বঙ্গবন্ধুকে লক্ষ্য করে গুলি চালায়, তিঁনি সিঁড়িতে পড়ে গেলেন। তখন এই বেঈমানের বাচ্চারা বঙ্গবন্ধুর মাথার পিছনে একটা, বুকের নীচে একটা এবং হাতের আঙ্গুলে গুলি করে সাথে সাথে পেছনে দরজায় দাঁড়িয়ে থাকা বেগম মুজিব বেরিয়ে আসলে তাকেও গুলি করে হত্যা করা হয়। কাজের ছেলে আব্দুল বেরিয়ে এলে তাকে গুলি করলে সে আহত হয়ে মাটিতে পড়ে যায়। আত্ম রক্ষার জন্য বাথরুমে যারা ছিল তাদেরকে একে একে গুলি করে হত্যার পর ছোট্ট শিশু শেখ রাসেলকে তারা তার মায়ের লাশের পাশে নিয়ে গুলি করে হত্যা করে।

পরে তারা মিন্টু রোডে তৎকালীন কৃষিমন্ত্রী আব্দুর রহমান সেরনিয়াবাদ ও তাঁর স্ত্রী, কন্যা, পুত্র, নাতি ও ভ্রাতস্পুত্রকে এক এক হত্যা করে। শুধু তাই নয় এই বাড়িতে থাকা নান্টু, কাজের লোক ও পুলিশকেও তারা হত্যা করেছিল। এই বাসায় বঙ্গবন্ধুর সেজবোন আমেনা বেগম ও মেয়ে বুলেটবিদ্ধ হন এবং চিকিৎসা নিয়ে সুস্থ হন। ঘাতকরা তারপর যায় ধানমন্ডিতে শেখ মনি’র বাসায়। সেখানে তাঁর অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী আরজুমনিকেও গুলি করে হত্যা করে। এই বাসায় তার ছেলেরা খাটের নীচে লুকিয়ে থাকায় আল্লাহ পাকের অশেষ কৃপায় বেঁচে যায়।

এইভাবেই ১৫ আগস্ট ক্ষমতা লোভী ঘাতকরা, স্বাধীনতার শত্রুরা ধানমন্ডির ৩২ নম্বরে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান, বেগম শেখ ফজিলাতুননেছা মুজিব রেনু, শেখ কামাল, শেখ জামাল, শেখ রাসেল, শেখ কামালও শেখ জামালের নববধু সুলতানা ও রোজী, জাতির জনকের ভাই শেখ নাসের ও কর্নেল জামীলসহ স্বজনদের ঐ রাতে খুন করা হয়। পরদিন ১৬ আগস্ট জল্লাদের দল তাদের কমান্ডারের নির্দেশে লে. ক. আবদুল হামিদকে দিয়ে ১২ জন সৈন্যসহ জাতির জনকের লাশ হেলিকপ্টারে করে টুঙ্গিপাড়ায় পাঠানো হয় এবং সেখানে থাকা জাতির জনকের বাড়ির তৎকালীন ইমাম মৌলভী আব্দুল হালিমের নেতৃত্বে লাশের গোসল করিয়ে মা-বাবার কবরের পাশে দাফন করে কবরটি প্রহরায় রেখে ঢাকায় চলে আসে।

ঘাতকরা ভেবেছিল চিরদিনের জন্য তারা রাষ্ট্রক্ষমতায় থাকবে কেউ তাদের বিচার করতে পারবেনা কিন্তু মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের অশেষ কৃপা ও রহমতে জাতির জনকের দুই সুযোগ্য কন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনা ও শেখ রেহেনা বেঁচে যান এবং রাষ্ট্র ক্ষমতায় আসেন। জীবনের সর্বোচ্চ ঝুঁকি নিয়ে তিনি এদেশের শাসনভার গ্রহণ করে ঘাতকদের বিচার কাজ সম্পন্ন করে চলেছেন এবং বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা বিনির্মাণে কজে করে যাচ্ছেন এবং তিনি তা করতে সক্ষম হয়েছেন। আশা করি, ২০৪১ সালের মধ্যে জননেত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে এ দেশ বিশ্বের বুকে সকল ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ শিখরে পৌঁছাবে ইনশাআল্লাহ এবং বাংলাদেশ হবে উচ্চ আয়ের দেশ। এজন্যেই বাঙ্গালি আজ বুঝতে পেরেছে তোমার হাতে থাকলে দেশ-পথ হারাবেনা বাংলাদেশ।

হত্যাকারীদের বাঁচানোর জন্য সামরিক শাসক জিয়াউর রহমান কর্তৃক জারিকৃত কালো আইনঃ-

একথা অনস্বীকার্য যে ১৯৭৫ পরবর্তী কোন সরকারই বঙ্গবন্ধু হত্যাকান্ডের বিচার নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে কোন পদক্ষেপ গ্রহণ করেনি। বরং মানব সভ্যতার উপর কালিমা লেপন করে প্রণয়ন করা হয়েছিল ইনডেমনিটি অর্ডিন্যান্স। হত্যাকারীদের স্থান দেওয়া হয় আইনের উর্ধ্বে। শাস্তি প্রদানের পরিবর্তে তাদের পুরষ্কৃত করা হয় বিভিন্ন বৈদেশিক দূতাবাসে চাকুরি দানের মাধ্যমে। ১৯৯১ সালে স্বৈরাচারী এরশাদের পতন ঘটিয়ে গণতন্ত্রের যে অভিযাত্রা শুরু হয় , সেই সরকারের আমলেও বঙ্গবন্ধু হত্যাকান্ডের বিচারের কোন উদ্যোগ গ্রহণ করা হয় নাই।

জাতির পিতাকে সপরিবারে হত্যার পরবর্তী ২১ বছর জোর প্রচেষ্ঠা চালনো হয়েছে তাঁর নাম ইতিহাস থেকে চিরতরে মুছে ফেলতে এবং তাঁর প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক দল “বাংলাদেশ আওয়ামীলীগ” কে ধ্বংস করার জন্য, যা বাংলদেশের প্রতিটি আন্দোলন-সংগ্রামে নেতৃত্ব দিয়েছে। কিন্তু তারা বুঝতে পারেনি সত্য কখনো ঢেকে রাখা যায় না। কেননা বঙ্গবন্ধু চিরঞ্জীব, মৃত্যুঞ্জয়ী। তিঁনি বেঁচে থাকবেন বিশ্ব ইতিহাসে, বাঙ্গালির হৃদয়ে, স্মরণে শ্রদ্ধায় বাঙ্গালি জাতির স্বপ্ন সারথি হয়ে বেঁচে থাকবেন মহান বিজয়রথ হিসেবে। যারা জাতির পিতাকে হত্যার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত ছিল তারা-ই ঘৃণার পাত্র হয়ে কুখ্যাত মীরজাফররে মত কালো ইতিহাসে বেঁচে থাকবে। কেননা ইতিহাস কাউকে ছাড় দেয়না। এই বাংলার মাটিতে ঘাতকদের বিচার একদিন হবেই হবে ইনশাল্লাহ।

 

The Daily Narsingdir Baniলেখকঃ প্রিন্সিপাল এম, হানিফা                                                                                                                              প্রতিষ্ঠাতা ও প্রিন্সিপাল                                                                                                                                        নরসিংদী অক্সফোর্ড কলেজও ফেমাস ইন্সিটিটিউট হাই স্কুল

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button