ফিচারব্লগ

বাংলাদেশের দুর্নীতির স্বরূপ ও এর প্রতিকার

শেয়ার করুনঃ

The Daily Narsingdir Bani

কিছুদিন আগে ৩৮তম বিসিএস পরীক্ষার ফলপ্রকাশের পর কয়েকটি বিষয় নিয়ে সামাজিকযোগাযোগমাধ্যম, এমনকি গণমাধ্যমেও ব্যাপকআলোচনা হচ্ছে। এত অধিকসংখ্যক ছাত্রছাত্রীকেন বিসিএস চাকরির জন্য আবেদন করেন, ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়াররা কেন সাধারণ ক্যাডার পদেঢুকছেন, বেসরকারি চাকরি কিংবা গবেষণারদিকে মেধাবী ছেলেমেয়েরা কেন আকৃষ্ট হচ্ছেননা ইত্যাদি। অনেক লেখালেখি ও মন্তব্যের মধ্যেএকজন অবসরপ্রাপ্ত শীর্ষ পর্যায়ের আমলা এবংসুপরিচিত একজন শ্রদ্ধেয় বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকেরমতামতের প্রতি আমার দৃষ্টি আকৃষ্ট হয়েছে।শেষোক্ত জনকে আমি শ্রদ্ধা করি এবং তারলেখার আমি একজন একনিষ্ঠ পাঠক।

জুলাইয়েরপ্রথম সপ্তাহে একটি অনলাইন পত্রিকায় সাক্ষাতকারে তিনি বলেছেন, ‘দুর্নীতির ব্যাপকতাই বিসিএসের প্রতি মোহ তৈরি করেছে।’‘সমাজ-রাজনীতির সর্বত্র দুর্নীতি গ্রাস করেছে।অনিয়মই নিয়ম হয়ে গেছে।’ ‘প্রশাসনের কর্তারাজানেন, দুর্নীতি করে পার পাওয়া যায়।’ তবেতিনি এও বলেছেন, ‘সবাই হয়তো দুর্নীতি করেননা।’ ‘তাঁর মতে, ‘বিসিএস পরীক্ষায় কেন এতমোহ, এ প্রশ্ন গণমাধ্যমের তোলা উচিত। উত্তরওবের করতে হবে। তাহলেই দেখবেন মোহ কেটেযাবে। তখন এ শিক্ষা ব্যবস্থা থেকেই বিজ্ঞানী, গবেষক, ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার তৈরি হবে।’

‘দুর্নীতির ব্যাপকতাই বিসিএসের প্রতি মোহতৈরি করেছে’—এ মন্তব্যের সঙ্গে একমত হতেপারছি না। এ মন্তব্যের মাধ্যমে প্রকারান্তরেবোঝানো হয়েছে যে বিসিএস চাকরিতে ঢুকেঅবাধে দুর্নীতি করে অর্থ উপার্জনের সুযোগরয়েছে এবং এ সুযোগের সদ্ব্যবহার করেধনসম্পদের অধিকারী হওয়ার জন্যই মেধাবীছাত্রছাত্রীরাও বিসিএস পরীক্ষার দিকে ঝুঁকছেন।একজন সরকারি কর্মচারী হিসেবে আমলাতন্ত্রেরভেতর-বাইরে যেমন দেখেছি, তেমনিবাংলাদেশের অন্যান্য পেশা, সমাজ ও রাজনীতিপর্যবেক্ষণেরও সুযোগ হয়েছে।

সার্বিক আলোচনার আগে আমলাতন্ত্র ও এর‘দুর্নীতির’ বিষয় নিয়েই প্রথমে আলোচনা করতেচাই। এ দেশের আমলাতন্ত্র ব্রিটিশ আমলাতন্ত্রেরউত্তরাধিকার। ইউরোপ, আমেরিকা, চীন প্রভৃতিদেশে বহু আগে থেকেই সরকারের উচ্চপদেরচাকরিতে প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার মাধ্যমেলোক নেয়া হতো। সরকার পরিচালনার জন্যএকটি প্রশিক্ষিত নিয়মিত জনবলের প্রয়োজন।সুপিরিয়র পদে চাকরির মোহ এ দেশে নতুনকিছু নয়। ব্রিটিশ ভারতে আইসিএস, আইপিএস, আইএফএস, আইএএস প্রভৃতি পদেপ্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার মাধ্যমে মেধাবীরাইস্থান পেত। এর ধারাবাহিকতায় পাকিস্তান ওবাংলাদেশেও মেধাবী ছাত্রছাত্রীরাপ্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার মাধ্যমে প্রশাসন, পুলিশ, ফরেন সার্ভিস প্রভৃতি পদে যোগ দেন।আগে ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ারদের চাকরি ক্যাডারভুক্ত ছিল না।

১৯৮২ সালে ক্যাডারসার্ভিস প্রথা প্রবর্তনের পর ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, শিক্ষক প্রভৃতি পেশাজীবীর চাকরিও ক্যাডারভুক্তকরা হয়েছে। তবে সার্ভিসের পদবিন্যাসেরকারণে সব ক্যাডার থেকে যুগ্ম সচিব-সচিবহওয়ার পথটি এক রকম নয়। প্রশাসন ক্যাডারেরজন্য এসব পদ সরাসরি ক্যাডার পদের মতো।কিন্তু অন্যান্য ক্যাডার থেকে ‘বিশেষ’ সুযোগেরমাধ্যমে এসব পদে আসতে হয়। একজনইঞ্জিনিয়ার পিডব্লিউডি, সড়ক ও জনপথ বাঅনুরূপ ডিপার্টমেন্টে চাকরিতে যখন নির্বাহীপ্রকৌশলী হিসেবে যোগ দেন, তখন দেখা যায়তার একই ব্যাচের প্রশাসন ক্যাডারের সহকর্মীটিযুগ্ম সচিব। অন্যদিকে বিসিএস পরীক্ষা দিয়েডাক্তার হওয়ার পর একজন চাকুরেকে প্রথমেইমেডিকেল অফিসার হিসেবে উপজেলা বা গ্রামেযেতে হয়। মেধা ও যোগ্যতার বলে যারা সরকারিমেডিকেল কলেজে লেকচারার হিসেবে চান্সপান, তারা পরবর্তীতে সহযোগী অধ্যাপক কিংবাঅধ্যাপক হতে পারেন। একজন সিনিয়র অধ্যাপকডাক্তার শেষ বয়সে হয়তো অতিরিক্ত সচিবেরমর্যাদা পান। ইঞ্জিনিয়ারিং ডিপার্টমেন্টগুলোয়ওশীর্ষ পদটি থাকে অতিরিক্ত সচিব পদমর্যাদার।অন্যান্য ক্যাডারে গ্রেড-১ পদ থাকলে সচিবপদের বেতন পাওয়া গেলেও সচিবের মর্যাদাপান না। কলেজশিক্ষকদের পদোন্নতির অবস্থাআরো জটিল। এ পরিস্থিতিতে বর্তমানে সবসাধারণ বিশ্ববিদ্যালয়, ইঞ্জিনিয়ারিং বিশ্ববিদ্যালয়বা মেডিকেল কলেজের ছাত্রছাত্রীরা বিসিএসেপ্রথম, দ্বিতীয় ইত্যাদি পছন্দক্রম হিসেবেপ্রশাসন, ফরেন সার্ভিস, পুলিশ, অডিট-অ্যাকাউন্টস, কাস্টমস-ট্যাক্স প্রভৃতি ক্যাডারদেয়ার পর শেষের দিকে ইঞ্জিনিয়ারিং, মেডিকেলবা শিক্ষা ক্যাডার পদের ‘পছন্দ’ দিয়ে থাকেন।ক্যাডারবৈষম্য দূরীভূত না হলে ইঞ্জিনিয়ার-ডাক্তারদের স্ব-স্ব পেশার চাকরি গ্রহণে বাধ্য করাযাবে না।

‘দুর্নীতির ব্যাপকতাই বিসিএসের প্রতি মোহতৈরি করেছে’—এ মন্তব্য একেবারেই অযৌক্তিকও বিদ্বেষভাবাপন্ন। সরকারি অফিস ছাড়া দেশেআর কোথাও কি দুর্নীতি নেই? একটি বিষয়সবারই জানা যে আজকাল সরকারি চাকরিতেযেমন নিরাপত্তা, বেতন বৃদ্ধি, পদোন্নতি, সম্মানও অন্যান্য লজিস্টিক সুযোগ-সুবিধা রয়েছে, বেসরকারি চাকরিতে তেমনটি নেই। বিদেশীব্যাংক কিংবা মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানিতে পদেরসংখ্যা সীমাবদ্ধতা ও চাকরির শর্তাবলির কারণেএসব চাকরি আজকাল আর তেমন আকর্ষণীয়নয়। বেসরকারি উদ্যোক্তা-ব্যবসায়ীর অধীনচাকরির নিশ্চয়তা যেমন কম, বেতনও যথেষ্টনয়।

বিশ্ববিদ্যালয়সহ বেসরকারি শিক্ষা-প্রতিষ্ঠান কিংবা গবেষণা সংস্থাগুলোর বেতন ও অন্যান্যসুযোগ-সুবিধাও এখন আর মেধাবীদের আকর্ষণকরতে পারে না।
সরকারি অফিসে দুর্নীতিবাজ কর্মচারী যেমনরয়েছেন, দুর্নীতি না করে সৎ জীবনযাপন করেনএমন কর্মকর্তা-কর্মচারীও রয়েছের ভূরি ভূরি।এসব কর্মকর্তা-কর্মচারী দেশের অগ্রগতির জন্যনিঃস্বার্থভাবে কাজ করে বলেই দেশ এগিয়েযাচ্ছে এবং সরকার ব্যবস্থা টিকে আছে।নিঃসন্দেহে সরকারের সহায়তাকারী হিসেবেআমলাতন্ত্রের অর্থাৎ বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানেরউচ্চপদে সৎ ও মেধাবী কর্মকর্তা নিয়োজিত থাকাপ্রয়োজন। বিসিএস পরীক্ষার মাধ্যমেই এরূপকর্মকর্তা নির্বাচন করা হয়।

সততা, নৈতিকতা, কর্তব্যনিষ্ঠা, ন্যায়বিচার, চারিত্রিক পবিত্রতা, সত্যবাদিতা, দেশপ্রেম প্রভৃতিবিষয় পরস্পর সম্পর্কযুক্ত এবং সরকারি দায়িত্বপালনের ক্ষেত্রে একটি অন্যটির পরিপূরক। সবগুণের সমাহার আবার একসঙ্গে পাওয়া যায় না।কারো ক্ষেত্রে দেখা যায়, তিনি ঘুষ নেন না, কিন্তুনিজ দায়িত্ব যথাযথভাবে যথাসময়ে পালনকরেন না। কাজ করতে বিলম্ব করেন, ফাইলপড়ে থাকে। দায়িত্ব নিতে ভয় পান, কঠিন কাজএড়িয়ে চলেন। এক্ষেত্রে তার ‘ঘুষ’ না নেয়ারসততা মূল্যহীন। অনেক ‘সৎ’ অফিসারের ধারণা, দেশে তিনিই একমাত্র সৎ ব্যক্তি। অন্য সবাই তারতুলনায় অসৎ। কেউ কেউ জুনিয়র সহকর্মীর কৃতঅপরাধ নিশ্চিতভাবে প্রমাণিত হওয়ার আগেইতাকে শাস্তি দেন। অফিস-আদালতে গীবত, পরনিন্দা, কাউকে অপবাদ দেয়া, নিজেরপদোন্নতির জন্য অন্যকে হেয় করা, দুর্নামরটানো, অন্যের ক্ষতি ও অনিষ্ট করা ইত্যাদিনিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার; যা আমাদের কালচারহয়ে দাঁড়িয়েছে। ঘুষ গ্রহণের মতো এগুলোওদুর্নীতির পর্যায়ে পড়ে। সরকারি কাজ হবেজনস্বার্থে এবং জনসেবামূলক। কিন্তুজনসাধারণের সঙ্গে সম্পর্ক না থাকলে, পদেপদে সেবাগ্রহীতাদের হয়রানি করা হলে কীভাবেজনসেবা হবে? একটা কথা আমরা মনে রাখি নাযে এ দেশের জনগণের ট্যাক্সের টাকায় আমরাপাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করে এখনসরকারি চাকরি করে বেতন খাচ্ছি।
ক্ষমতারঅপব্যবহার ও জনসাধারণের সঙ্গেঅসৌজন্যমূলক আচরণে জনদুর্ভোগ বাড়ে।একশ্রেণীর কর্মচারী ও সেবাগ্রহীতার ঘুষ গ্রহণ ওপ্রদানের মতো পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। অধিকাংশক্ষেত্রে যে কাজের জন্য ঘুষ আদান-প্রদান হয়, সেখানে উভয় পক্ষের ব্যক্তিস্বার্থ প্রাধান্য পায়, সরকার বা দেশের স্বার্থ প্রত্যাখ্যাত হয়।

দুর্নীতি দমন কিংবা প্রতিরোধের জন্য প্রতিষ্ঠানরয়েছে কিংবা রয়েছে বিচারালয়। সেসব জায়গায়যদি সততা ও নৈতিকতার ঘাটতি থাকে তাহলেদুর্নীতি প্রতিরোধ এবং ন্যায়বিচার কীভাবে হবে? শুধু সরকারি চাকরিতেই নয়, সততা ও নৈতিকসুআচরণ আমাদের জীবনের সর্বত্রই অত্যাবশ্যক।আমার দীর্ঘ চাকরিজীবনে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, বিভাগ কিংবা অধঃস্তন অফিসে কাজ করারসুযোগ হয়েছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, শিল্পোদ্যোক্তা প্রতিষ্ঠান, এনজিও, সেবামূলকপ্রতিষ্ঠান, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান, পরামর্শকপ্রতিষ্ঠান, ব্যাংক কিংবা বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান সবজায়গায় ভালো মানুষ ও অসৎ মানুষ দুই-ইরয়েছে। একশ্রেণীর শিক্ষক যে কী পরিমাণ অসৎও নীতিহীন, তা শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে কাজ করারসুবাদে দেখেছি বহু নীতিহীন ঠকবাজ,স্বার্থপরউদ্যোক্তা-ব্যবসায়ীকে দেখার সুযোগ হয়েছেবাণিজ্য মন্ত্রণালয়, শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও এনবিআরেকাজ করার সুবাদে। ব্যাংকের টাকা লুটপাট, ঋণগ্রহণের নামে অর্থ আত্মসাৎ, বিদেশে অর্থপাচার, ইচ্ছাকৃতভাবে ঋণখেলাপি হওয়া এখনদেশে উদ্বেগজনকভাবে বেড়ে গেছে।

বিচারব্যবস্থায় কোনো কোনো ক্ষেত্রে ঘুষ গ্রহণেরমাধ্যমে অবৈধ সুবিধা প্রদান, মিথ্যা সাক্ষ্য দিয়েনিরপরাধকে ফাঁসিয়ে দেয়া, অনৈতিকভাবেকাউকে ন্যায়বিচার বঞ্চিত করা, অপরাধীকেছেড়ে দেয়া—এসব ঘটনাও হরহামেশা শোনাযায়। আইন প্রয়োগকারী সংস্থার একশ্রেণীরকর্মচারীর ক্ষমতার অপব্যবহার ও দুর্নীতিও নতুনকিছু নয়।বাংলাদেশের মানুষের যেমন রয়েছে সংগ্রামীইতিহাস ও ঐতিহ্য, ধর্মপ্রাণ, অতিথিপরায়ণ, পরোপকারী, সহজ-সরল মানুষ হিসেবে দেশে-বিদেশে প্রচুর সুনাম, তেমনি রয়েছে প্রতারণা, পরনিন্দা, স্বার্থপরতা, পরশ্রীকাতরতা, দুর্নীতি ওঅসততার দুর্নাম। বিদেশী ঐতিহাসিক, পরিব্রাজক, শাসক, গবেষক অনেকেই বাঙালিচরিত্রের স্বরূপ উদ্ঘাটন করেছেন। বাংলাদেশেরসৈয়দ মুজতবা আলী, আবুল মনসুর আহমেদ, হুমায়ুন আজাদ প্রমুখ লেখকও বাঙালিচরিত্রচিত্রণে পারদর্শিতা দেখিয়েছেন। অনেকের মতে, বিভিন্ন সময়ে বিদেশী শাসকদের দ্বারাশাসিত হওয়া এবং পাকিস্তান ও বাংলাদেশ উভয়আমলে স্বৈরাচারী শক্তির ক্ষমতা দখলও দেশেদুর্নীতি বিস্তারের অন্যতম কারণ। বর্তমানে দুর্নীতিসমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে ঢুকে গেছে। শিক্ষক, বুদ্ধিজীবী, গণমাধ্যমকর্মী, জনপ্রতিনিধি, রাজনৈতিক টাউট, ব্যবসায়ী এমনকি সাধারণমানুষ কার মধ্যে দুর্নীতি নেই? একশ্রেণীর শিক্ষকক্লাসে না পড়িয়ে প্রাইভেট পড়ান, প্রাইভেট নাপড়লে ছাত্রকে ভালো নম্বর দেন না, ওষুধেভেজাল, খাদ্যে ভেজাল, বেসরকারি হাসপাতালেগলাকাটা চিকিৎসা খরচ আদায়, চাকরি দেয়ারনামে প্রতারণা, সমবায় সমিতির নামে সাধারণসঞ্চয়ীদের অর্থ আত্মসাৎ, জোরপূর্বক চাঁদাআদায়, মাপে বা ওজনে কম দেয়া, নির্বাচনে কারচুপি, মজুদদারি—কী নেই এ দেশে?

করোনামহামারীর এ দুর্যোগেও শাহেদ, ডা. সাবরিনা-আরিফের মতো প্রতারকরা ভুয়া করোনা রিপোর্টদিয়ে অর্থ আত্মসাতের পাশাপাশি দেশে-বিদেশেবাংলাদেশকে হেয় করেছেন। করোনা মহামারীরসময়ে দরিদ্র অসহায় মানুষকে প্রদত্ত অর্থ ও চালকতিপয় জনপ্রতিনিধি আত্মসাৎ করেছেন।কিছুদিন আগে সম্রাট, জিকে শামীম, পাপিয়াদেরদৌরাত্ম্যও মানুষ দেখেছে। একশ্রেণীর আদমবেপারি বিদেশ গমনেচ্ছু মানুষদের টাকা মেরেনিঃস্ব করে দিয়ে অনেককে মৃত্যুর মুখে ঠেলেদিচ্ছে। একশ্রেণীর ডেভেলপার জমি কিংবা ফ্ল্যাটবিক্রির নামে মানুষের টাকা আত্মসাৎ করছে।দেশের একশ্রেণীর মানুষ দুর্বৃত্তায়নে মেতেউঠেছে। এরা খুন, রাহাজানি, চুরি-ডাকাতি ওনারী ধর্ষণের মতো অপরাধে লিপ্ত। হাসপাতালেস্বজন মারা গেলে কেউ কেউ ডাক্তারেরঅবহেলার অজুহাতে ভাংচুর করে, ডাক্তার খুনকরে। ছেলে ধরার মিথ্যা অভিযোগে স্কুলেরসামনে গণপিটুনি দিয়ে অভিভাবক মেরে ফেলে।যত দিন যাচ্ছে, দুর্নীতি, প্রতারণা ও অপরাধেরধরন পাল্টাচ্ছে। বাঙালি এ ব্যাপারে বেশইনোভেটিভ।

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডে কাজ করার সুবাদে দেখেছিদেশের ১৭ কোটি মানুষের মধ্যে মাত্র ২২ লাখলোক সরাসরি আয়কর দেয়। আয়করদাতাব্যবসায়ী ও প্রতিষ্ঠানেরও অনেকে প্রদেয় করেরচেয়ে কম আয়কর পরিশোধ করে। বহু ব্যবসায়ীসঠিক ভ্যাট প্রদান করেন না। আয়কর ও ভ্যাটসংগ্রহকারীরাও ঘুষ নিয়ে রাজস্ব ফাঁকিতেসহায়তা করেন। আয়কর প্রদানে যোগ্য সবাইআয়কর দিলে এবং কর ফাঁকি রোধ করা গেলেরাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা অর্জন সম্ভব হতো।

শোনা যায়, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের একশ্রেণীরশিক্ষক নিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়মিত ক্লাস নাকরিয়ে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্লাস নেন। আবারএকশ্রেণীর শিক্ষক আছেন, যারা গবেষণা ওপ্রজেক্টের কাজ করে নিজ বিভাগের ছাত্রদেরসিলেবাস শেষ করার সময় পান না। ক্লাস ফাঁকিদেন। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক নিয়োগেস্বজনপ্রীতি ও দলীয় আনুকূল্যের কথা শোনা যায়প্রায় সময়ই। অনেক পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়েরশিক্ষক-কর্মকর্তাদের প্রাপ্যের চেয়ে অতিরিক্তবেতন-ভাতাদি নেয়ারও অডিট আপত্তি রয়েছে।কিছু বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ও ইংলিশমিডিয়াম স্কুল যে উচ্চহারে ছাত্রদের কাছ থেকেটিউশন ফি আদায় করে, তাতে অভিভাবকদেরনাভিশ্বাস ওঠার উপক্রম হয়।

এত কিছুর মধ্যেও সৎ, নিষ্কলুষ চরিত্রেরঅধিকারী, সত্যবাদী, দেশপ্রেমিক মানুষেরসংখ্যাও অনেক। সেজন্য দুর্নীতির ব্যাপকতারজন্য কেবল সরকারি কর্মকর্তা কিংবা কোনোবিশেষ শ্রেণীকে দোষারোপ করা যাবে না। তারাএ দেশের এ সমাজেরই একটা অংশ। দেশেরমানুষের মধ্য থেকে নীতি-নৈতিকতা যখন উঠেযায়, তখনই দুর্নীতি জেঁকে বসে। শুধু ঘুষ গ্রহণইদুর্নীতি নয়। ঘুষ দুর্নীতির একটি অংশ মাত্র।
বাংলাদেশের ৯০ শতাংশ মানুষই ইসলামধর্মাবলম্বী। ঘুষ-দুর্নীতি, গীবত-পরনিন্দা, সম্পদআত্মসাৎ, মিথ্যাচার, মজুদদারি, প্রতারণা, ওজনে কম দেয়া, ভেজাল দেয়া, ন্যায়বিচার না করা—এসবের জন্য কঠোর শাস্তির হুঁশিয়ারিরয়েছে আমাদের ধর্মে। দেখা যায়, ধর্মবিশ্বাসীঅনেকেও ইসলামের কঠোর আদেশ-নিষেধপালন করেন না। এসব দেখে মুসলমানের ঘরেজন্ম নেয়া কিছু অবিশ্বাসী লোক আবার মুসলিমও ইসলাম ধর্মের নিয়মাচারের বিরুদ্ধাচরণেরওসুযোগ পেয়ে যায়। তার পরও জোর দিয়ে বলাযায়, ধর্মীয় ও নৈতিক শিক্ষা মানুষকে সুপথেআনতে পারে। শৈশব থেকে পারিবারিক পরিবেশেসন্তানদের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার পাশাপাশিনীতিনৈতিকতার শিক্ষা দিতে হবে।ছেলেমেয়েদের পরীক্ষা পাসের প্রতি যেমন গুরুত্বদিতে হবে, তাদের চরিত্র গঠনের প্রতিওঅভিভাবকদের মনোযোগী হতে হবে।দেশে আইনের শাসনের ঘাটতি হলেও দুর্নীতিবাড়ে বলে অনেকে মনে করেন। সরকার এবংদেশ ও সমাজের দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের কর্তব্যহওয়া উচিত আমাদের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানগুলোয়যোগ্য ব্যক্তি পদায়ন করে এগুলোয় সততা ওনিরপেক্ষতার লালন করা। সব সরকারি অফিস, বিশ্ববিদ্যালয়সহ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, পেশাজীবীসংগঠন ও সব সাংবিধানিক ও অনুরূপ প্রতিষ্ঠানও কমিশন থেকে রাজনৈতিক লেজুড়বৃত্তি উপড়েফেলা এখন সময়ের দাবি। সুশাসন ও আইনেরশাসনই হলো দুর্নীতি দমনের চাবিকাঠি।

মোশাররফ হোসেন ভূঁইয়া: সাবেক সিনিয়রসচিব ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সাবেকচেয়ারম্যান

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button