ব্লগ

আগস্ট ১৪ । সত্য ঘটনা অবলম্বনে দৃষ্টিনন্দন নির্মাণ

নূরে আলম সিদ্দিকী সজল

শেয়ার করুনঃ
আগস্ট ১৪ । সত্য ঘটনা অবলম্বনে দৃষ্টিনন্দন নির্মাণমানুষ গভীরে থাকে না, গভীরে থাকে মানুষের মন!
➖➖➖➖➖➖➖➖➖➖➖➖➖➖➖
ইতিপূর্বে এই ওয়েব ফিল্ম নিয়ে বহু আলোচনা-সমালোচনা হয়ে গিয়েছে। তাই সবার মতো করে নয় নিজের মতো করেই নিজের অভিব্যক্তি প্রকাশের ক্ষুদ্র-প্রয়াস এই লেখাটি। তবে সবার আগে বলে নিচ্ছি যারা ১৮ বছরের নিচে কিংবা রগরগে/রক্তারক্তি’র দৃশ্য দেখতে অভ্যস্থ নন কিংবা যার বুঝেন না কোনটা প্রয়োজনের তাগিদ কোনটা অপ্রয়োজনের তাগিদ! তাঁরা অনুগ্রহ করে এই ফিল্মটি দেখবেন না, এমনকি আমার লেখাটিও পড়বেন না। অনুগ্রহ করে এতো সতর্কতার পরেও ফিল্মটি দেখে “লা হাওলা ওয়ালা কুয়াতা” বিভিন্ন জায়গায় লিখে বেড়াবেন না।
তো যাই হোক দুর্জন ফেলে ফিল্মে ফিরে যাওয়া যাক। ওয়েব ফিল্মের সাথে আমাদের পরিচিতি কম, যদিও নেটফ্লিক্সের বদৌলতে বিদেশী ভাষার বিভিন্ন ওয়েব ফিল্মের সাথে আমাদের পরিচয় রয়েছে। তবে দেশীয় ওয়েব ফিল্মের চাহিদা দিনদিন বেশ বাড়ছে। কিন্তু সত্যি বলছি, এতোদিনের ওয়েব ফিল্ম গুলোকে নেহাত ১ঘন্টার একটি নাটক’কে কেটে কেটে উপস্থাপন ছাড়া আর তেমন কিছুই লাগে নাই। তো কিছুদিন আগে এই ওয়েব ফিল্মের ট্রেইলার দেখে বেশ ভালো লাগলো। আরো বেশি আগ্রহ জন্মালো যখন দেখলাম সত্য-ঘটনার আলোকে নির্মিত! এর চাইতেও ঢের আগ্রহ জন্মেছে যখন দেখলাম জনাব ‘শিহাব শাহিন’ নিজের অনেক দিনের ধারা থেকে বের হয়ে অভূতপূর্ব কিছু নির্মাণ করতে যাচ্ছেন। অপর দিকে ট্রেইলারে সত্য ঘটনা নিয়ে নির্মিত এই ফিল্মের অনেক চুম্বক অংশ দেখানো হয়েছে যা দেখে প্রতিটা মানুষের অপেক্ষার প্রহর শুরু হয়ে গিয়েছিলো। এক ট্রেইলারেই যে ধরণের কালার গ্রেডিং প্লাস গা-হিম করা  আবহসংগীত পেয়েছি আমরা, এতে করে থ্রিলার প্রেমীরা অনায়েসে এই সিরিজটিকে তাদের কার্ট লিষ্টে রেখে দিবেন। তো চলুন এবার বাদবাকি আলোচনায় যাওয়া যাক।
.
পরিচালনা এবং বাদবাকিঃ
➖➖➖➖➖➖➖➖➖
যেহেতু সত্যি ঘটনা নিয়ে নির্মিত সিরিজ সেহেতু বেশ শক্ত চ্যালেঞ্জ ছিলো সকল কলাকুশলীদের জন্য। আরো শক্ত বলছি কেননা এই ঘটনার তেমন কোনো আইডিয়া সকলের সামনে আসে নি। তাই এই সিরিজ দিয়ে সকলের মনে দাগ কাটানো বেশ অসাধ্যই ছিলো। তার উপরে আবার আমাদের দেশে সত্য ঘটনা নিয়ে তেমন নির্মাণও নেই। সবার আগে বলবো
শিহাব শাহিন‘এর দুর্ধর্ষ চিন্তা ভাবনা নিয়ে। হলফ করে বলতে পারি এই ঘটনা নিয়ে যাদের ধারণা নেই, তাঁরা পুরো সিরিজ দেখার পর বেশ ধাক্কা খাবেন। পরিচালক মাত্র মিনিট দশেকের মাঝেই এমন একটি আবহাওয়ার তৈরি করেছেন যাতে অপেক্ষা আপনাকে করতেই হবে। সত্যি বলতে কি বাংলাদেশে খুব কম নাট্যনির্মাতা রয়েছেন যারা নিখুঁত কাজ করেন। আমি বলবো এই সিরিজের জন্য নিখুঁত শব্দটি একদম যথার্থ। সিরিজে উঠে এসেছে সেই ২০১৩ সালের প্রাত্যহিক
হিসাব নিকাশ। যেমন ধরুন ১৫ই আগষ্টে রাস্তাঘাট কেমন ছিলো, আরো বুদ্ধিদীপ্ত লেগেছে তখনকার সময়েরই হিট হওয়া হিন্দি গানের সংযোজন। আমি চিন্তা করি কতোটা নিখুঁত নির্মাতা হলে ঠিক সেই লোকেশন গুলোই সিরিজে তুলে ধরা হয়ে থাকে, মানে আপনার কাছে মনে হবে আপনি বোধহয় ২০১৩ সালেই ফিরে গিয়েছেন। অনেক ভালোর মাঝে আরো একটি ভালো দিক হলো ঢাকাকে গা-হিম করা অবস্থায় তুলে ধরা। অপর দিকে সিরিজের সংলাপ বন্টন ছিলো অসাধারণ, যা বেশ রিয়েললাইফ ফিল দিয়েছে। তবে এহেন সংলাপ অনেকের ভালো না লাগতেই পারে, এজন্য আপনাকে প্রয়োজন এবং অপ্রয়োজনের সংজ্ঞা জানতে হবে। সে যাই হোক, ফিল্মের সংলাপের সাথে মচমচে কালার গ্রেডিং এবং শ্রুতিমধুর আবহসংগীত সিরিজটিকে বেশ নান্দনিকতা দিয়েছে। এছাড়া গল্পের মাঝে ছোট্ট আরো একটি গল্প দেখিয়ে সিরিজের গ্রহণযোগ্যতা আরো বাড়িয়ে দিয়েছেন নির্মাতা। বলছিলাম খালেদ চরিত্রের কথা, চাইলে উনাকে নায়ক বানিয়ে দেওয়া যেতো কিন্তু পরিচালক তাঁর বুদ্ধিদীপ্ত কৌশল দিয়ে গল্পের সাথে নিরেট এক বাঁধন তৈরি করেছেন, যা বেশ প্রশংসা পাওয়ার যৌগ্যতা রাখেন। সব মিলিয়ে নির্মাণের সাথে বাদবাকি সকল ধাপের বেশ মিষ্টি এক বাঁধন রয়েছে এই সিরিজে।
অভিনয়সংক্ষেপঃ
➖➖➖➖➖➖
🔹খালেদ (শতাব্দী ওয়াদুদ)
লোকটাকে ব্যক্তিগতভাবে বেশ পছন্দ আমার। উনার ফেইজবুক প্রোফাইল আমি নিয়মিত ভিজিট করি উনার সাবলীলতার জন্য, ফেইজবুকটাকে তিনি সেভাবে সিরিয়াসলি নেন না, এ কারণেই ভালো লাগে খুব। যাই হোক, ইতিপূর্বে নিজের নামকে সকলের মনে অবস্থান করিয়েছেন নিজ যোগ্যতা’তেই। গেরিলার সেই ওয়াদুদ কিংবা ঢাকা এটাকের সেই ওয়াদুদ কিংবা সামান্য ঝালমুড়ি ওয়ালা আবার মঞ্চ নাটকে গর্জন করে ডায়লগ দেওয়া লোকটা সব জায়গায় সেরা। এই সিরিজে চাইলে সে নিজের সেই গর্জনেই সকলের কাছে পৌছে যাওয়ার ক্ষমতা রাখেন। কিন্তু ওয়াদুদ সাহেব প্রধান চরিত্রকে বেশ প্রাধান্য দিয়েছেন নিজের অভিনয় কৌশলের মাধ্যমেই। শীহাব শাহিন এভাবে ওয়াদুদ সাহেবের থেকে অভিনয় বের করে আনবেন ভাবাই দুষ্কর ছিলো।
🔹তুশি (তাসনুভা তিশা)
নাট্যজগতে এতো এতো তিশার ভীড়ে এই তিশাকে ক’জনই বা চিনতেন। নিজেকে চেনাতে লেগে গেছে বেশ সময়। কিন্তু যখন নিজেকে চেনালেন, তখন সবার চোখ কপালে! বলছিলাম এই সিরিজের প্রাণভোমরার কথা, যিনি ফুঁটিয়ে তুলেছেন বেশ শক্ত একটি চরিত্র। আসলে উনাকে কি বলে সম্মোধন করবেন! অসাধারণ নাকি সর্বোপরি সেরা! সত্যি বলছি উনার অভিনয় দেখার পরে হলফ করে বলতে পারি, ‘তিশা নিজেকে প্রমাণ করেছেন, এবার ইন্ডাস্ট্রি তাঁকে কাজে লাগাতে না পারলে সে দায় একান্তই ইন্ডাস্ট্রির’। পুরো সিরিজ জুড়ে লাস্যময়ী এই নন্দিনীর অভিনয় আপনাকে স্ক্রিণ থেকে চোখ সরাতে দিবে না। কখনো বাবার অবাধ্য মেয়ে, কখনো অসৎ নেশায় ডুবে থাকা তরুণী, কখনো বা হিংস্র তরুণী! অভিনয়ের প্রতিটি স্কেলে ছাড়িয়ে গিয়েছেন নিজেকেই বারংবার। শেষমেশ একটাই কথা ইন্ডাস্ট্রির অবশ্যই উচিৎ এমন প্রতিভার মূল্যায়ন করা।
এছাড়া সিরিজের নাম ভূমিকায় থাকা মুনিরা মিঠু কিংবা শহিদুজ্জামান সেলিমরাও করেছেন অসাধারণ। এক কথায় বলা যায় ফিল্মের প্রতিটা কলাকুশলীদের নিজেদের সেরাটাই দিয়েছেন।
কাহিনীসংক্ষেপঃ🔍
➖➖➖➖➖
গল্পটা আমাদের সবারই জানা তাই নতুন করে বলার কিছু নেই। তারপরেও এই ফিল্মে দেখা মিলবে এক পুলিশ অফিসারের ব্যক্তিজীবনের টানাপোড়ানি, অন্যের সন্তানের বিভৎসতা দেখে নিজের সন্তানকে আঁকড়ে ধরা। একজন বখে যাওয়া তরুনীর ভয়াবহ জীবনে অণুগল্প।
পরিশেষে “আগষ্ট ১৪” দেখার মতো এবং উপভোগ্য ওয়েব সিরিজ। সাম্প্রতিক সমাজের যুবক-যুবতীরা কোন গহব্বরে হারিয়ে যাচ্ছে কিংবা চোখের রঙ্গিন স্বপ্নের কাছে বিবেক কীভাবে প্রতারিত হচ্ছে, তাঁর আদর্শ প্রমাণ হিসেবে থেকে যাবে এই নির্মাণ। সত্যি বলতে এ ধরণের বিষয় নিয়ে আমাদের ইন্ডাস্ট্রিতে আরো কাজ করা উচিৎ। আর সবশেষে একটা কথা, অনুগ্রহ করে কেউ পাইরেটেড কপি দেখবেন না, ইন্ডাস্ট্রির ক্ষতি করবেন না। মাত্র ২.৬৭ পয়সা দিয়ে একদিনের সাবস্ক্রিপশন কেনা যায়, অনুগ্রহ করে তবে কিনেই দেখুন। অবশ্যই পাইরেসির বিষয়ে উচ্চমহলের নজর দেওয়া উচিৎ।
একটা কথা আছে না! ভালোর মাঝে খারাপ না থাকলে ভালোটা চোখে কম পরে! তেমনি এই ফিল্মে কিছু চোখে লাগার মতো দিক নিচে দিয়ে দিলাম!
⇨ফিল্মের প্রথম দিকের (১ম এপিসোড) কালার গ্রেডিং এতো নিম্ন-মানের ছিলো যা চোখের শুভ্রতা নষ্ট করে।
⇨স্যামসাং ফোনে আইফোনের রিংটোন বেশ অস্বস্তির ছিলো
⇨প্রথম দিকে গল্পের শুরুটা বেশ স্লো ছিলো, যদিও ২য় এপিসোড থেকে সব ঠিকঠাক। হয়তো এটা আগ্রহ বাড়ানোর জন্য করা হয়েছে।
〰〰〰〰〰〰〰〰〰〰〰〰〰
এক নজরে আগষ্ট ১৪
➖➖➖➖➖➖➖
পরিচালকঃ  শিহাব শাহিন
রচয়িতাঃ      শিহাব শাহিন
শ্রেষ্ঠাংশেঃ    তাসনুভা তিশা, শহিদুজ্জামান সেলিম, মুনিরা মিঠু, শতাব্দী ওয়াদুদ সহ আরো অনেকে।
ধরণঃ           ক্রাইম থ্রিলার।
মিউজিকঃ    খৈয়াম শানু
ব্যাপ্তিকালঃ  ৮-এপিসোড
মুক্তিসালঃ    ২২শে জুলাই,২০১৯ইং
দেশঃ            বাংলাদেশ
ভাষাঃ           বাংলা
ব্যক্তিগত মতামতঃ ৯/১০

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button