সাহিত্য ও সংস্কৃতিগল্প

মুক্ত । সায়মা আক্তার বাঁধন

শিক্ষার্থী ,মনোবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

শেয়ার করুনঃ

মুক্ত

আজ আকাশে অনেক মেঘ। হয়তো বৃষ্টি নামবে।দিনটা কেমন যায় কে জানে?খুব ভোরেই একটা বাজে স্বপ্ন দেখে ঘুম ভেঙে গেছে।ঠিক বাজে বলা চলে না,সঠিক শব্দটা হবে ” অস্বস্তিকর”।এখন সকাল ৯ টা।মাথার রিনরিন শব্দটা অবিরাম বাজছে।যেনো একটা ড্রসফিলা ঘুরছে।

খারাপ স্বপ্ন নাকি কাউকে বলতে হয় না।তবু কাউকে বলতে ইচ্ছে করছে। রাফিনকে বলা যেতে পারে।ও শুনেই বলবে আউযুবিল্লাহ পড়ে পাশ ফিরে শুয়ে ছিলাম কিনা; আমার তো ঘুম ভেঙে গেলো কেনোই বা শুতে যাবো।

রাফিনের ফোনটা বেজেই যাচ্ছে। ঘুম জড়ানো চোখেই ফোনটা তুললো।মনেমনে স্নিগ্ধাকে একটা ঝাড়ি দিল।এই সাত সকালে ছুটির ঘুমটা কেন যে নষ্ট করে মেয়েটা।
– হুম বল কি বলবি?
আবেশে স্নিগ্ধার চোখটা বুজে এলো।রাফিনের এই ঘুম ভাঙ্গা গলার আওয়াজের জন্য কতবার যে এই একটা মানুষের প্রেমে পড়েছে তা ও নিজেও জানে না।
-আজ খুব অদ্ভুত একটা স্বপ্ন দেখেছি।
-এ আর নতুন কি!
-না! একেবারে অদ্ভুত খানিকটা কাফকার মেটামরফসিস এর মত।
-তুই ও কি তেলাপোকা হয়ে গেছিস নাকি!!
-ধুর! কি যে বলো তুমি?স্বপ্নটা খুব অস্বস্তিকর।আর সবচেয়ে বাজে হলো স্বপ্নে তুমি ছিলে।
-হাহাহা।তুই আমার ঘুম উড়িয়ে দিলি।আচ্ছা তুই কি লজ্জায় লাল হয়ে গেছিস নাকি?
-নাহ।মোটেও না।বরং আতঙ্কে ফ্যাকাশে হয়ে আছি।
-আচ্ছা বল শুনি তোর মেটামরফসিস!
-আমি দেখলাম তুমি আমায় বললে,তুই যদি এই মেয়েটার মত হতে পারিস তবে তোকে আমার সঙ্গী করবো মহাকাশে।আর আমি ধীরে ধীরে অন্য একটা মেয়ের মত হয়ে যাচ্ছিলাম।আর এই পরিবর্তনের সময়টায় আমার খুব কষ্ট হচ্ছিল।আমি স্বপ্নেও ব্যাথা অনুভব করছিলাম।
-আজগুবি স্বপ্ন সব।
-হুম।আচ্ছা রাখবো আমি। তুমি কি আরো ঘুমাবে?
-হ্যাঁ।
..
..
..
..
স্নিগ্ধার চোখটা ছলছল করে উঠলো।কেন? তা সে নিজেও জানে না।
আজ রাফিনের উপর আমি চরম বিরক্ত।ও আমায় একটুও সিরিয়াসলি নেই নি।তার উপর কি সুন্দর ঘুমিয়ে পড়লো? কিভাবে পারে একটা মানুষ।যদিও আমরা কোনো রিলেশনে নেই তবুও এতটুকু গুরুত্ব আমি কি আশা করতে পারি না।আজ বরং ও অন্যদিনের চেয়েও বেশি তামাশা করলো।খুব স্বাভাবিক যেই প্রশ্নটা ও করতো আজ তাও করলো না।কেন?
এতটুকুন ভালোও কি আমায় বাসে না?বন্ধু হিসেবেও না!

মাঝেমাঝে খুব ইচ্ছে করে ওকে সব বলে দেই।নিজের সব অধিকার আদায় করে নেই।কিন্তু পারি না তো। প্রত্যাখ্যানের ভয়ের চেয়ে কঠিন বাধা হয়ে দাঁড়ায় আমার নিজের মন।সত্যিই কি ভালোবাসি নাকি শুধুই মায়া।
ওর চোখের দিকে তাকালে আমি নিজেকে ঠিক রাখতে পারি না,মনে হয় আমি হারিয়ে ফেলছি নিজেকে।ওর চোখ যেন একটা চোরাবালির গর্ত।টেনে নিচ্ছে আমায়।এসব কি ভালোবাসার লক্ষণ? মনোবিজ্ঞান কি বলে? হয়তো সেকেন্ড ইয়ারে উঠে পড়বো। সেমিনারে যেতে হবে কাল।সেমিনারের কথায় মনে পড়লো।আজ শুভর খাতাটা ফেরত দিতে হবে অনেকদিন ধরেই আমার কাছে।

রাফিনের ঘুম ভেঙে গেছে।স্নিগ্ধা ঘুম ভাঙ্গানোর পর আর ভালো করে ঘুমাতে পারেনি সে।ওর কথা মনে পরতেই ফোন হাতে নিল।সকালে ভালো করে কথা বলেনি তাই অপরাধবোধ করছে।প্রথম বারেই ফোন রিসিভ হলো।ফোন ধরেছে আফিফ।স্নিগ্ধার ছোট ভাই ।
-হ্যালো,রাফিন ভাইয়া।আমি গেম খেলছি তুমি পরে কল দিও
-মার খাবি একদম।স্নিগ্ধা কই?
-আপু তো ছাদে গেছে।বললো মাথা ধরেছে কেউ যাতে ডাক না দেয়।
-আর তুই এই ফাঁকে গেম খেলছিস্?
-আরে না ভাইয়া।আপুর জানি কি হয়ছে আজ নিজেই আমাকে মোবাইল দিয়ে গেছে।
-কি বলিস এসব! তুই যা।ফোনটা ওকে দিয়ে আয়।
-আমাকে মারবে তো।
-তুই যা আমার কথা বলিস।কিচ্ছু বলবে না।
-হুম।তোমায় আমি ছাড়বো না।
– দাঁড়া,আসছি আমি বিকেলে, তোকে দেখাবো মজা।
-হ্যা বলো কি বলবে?
-আজ বিকেলে আসতে পারি?
-মন চাইলে এসো।
-এমন করে কথা বলছিস কেনো?
-জানি না।
-অবস্থা সিরিয়াস মনে হচ্ছে।
-জানি না।
-আচ্ছা।ঠিক আছে।আমার জন্য নুডুলস আর কফি বানা। আধ ঘন্টার মধ্যেই আসছি।
-আচ্ছা।
রাফিন আসলো ৪৫ মিনিট পরে।এসেই আফিফের সাথে দুষ্টুমি করতে লাগলো।
একটু পরেই স্নিগ্ধা এলো ; একটা ট্রে তে কফি, নুডুলস আর পানি নিয়ে। সম্ভবত,একটু আগেই গোসল করেছে।ভেজা চুলে নিজের নাম সার্থক করেছে।হালকা সবুজ রঙের শাড়িটা যেটা গত জন্মদিনে রাফিন দিয়েছিল সেটা আজ খুব অসাধারণ একটা পোশাক মনে হচ্ছে।চুপ করে একটানা তাকিয়েই ছিল রাফিন।মনে মনে ভাবছে,”ইশ,যদি একবার বলতে পারতাম তোর এই স্নিগ্ধতা আমি প্রতিদিন দেখতে চাই।সকালে,বিকেলে,রাতে,সবসময়। চুড়ির রিনঝিন আওয়াজে কল্পনা দমে এলো।
চোখগুলো এত অচেনা লাগছে কেনো?এই চোখজোড়া ,কিসের মায়ায় , কিসের নেশায় টলমল করছে!
নিজের ঘোর ভেঙে স্নিগ্ধাই বললো,
কি ব্যাপার,কফিটা জুড়িয়ে যায় যে?
-ওহ্।কফি ঠান্ডা করে খাওয়া নাকি স্বাস্থ্যের জন্য ভালো।তাই,আর কি!
-ওহ্ আচ্ছা,তবে নুডুলস খাও।
-হুম।খাচ্ছি।
-আমি তবে একটু ছাদে গেলাম।মা বারান্দায় আছে,দেখা করতে বলেছেন।মা ই নিশ্চয় তোমাকে আসতে বলেছেন?

স্নিগ্ধার এই অস্বাভাবিক ঠান্ডা ব্যবহার দেখে রাফিনের বুকে ধক করে উঠলো।কেমন যেন একটা ব্যাথা অনুভব করতে লাগলো। মনে হচ্ছিল সব বুঝি হারিয়ে যাচ্ছে।খানিকটা জোর করেই ও বললো,
-না,খালাম্মা আসতে বলেনি।আমার নিজেরই তোদের সবাইকে খুব দেখতে মন চাইছিলো।তাই চলে এলাম।
-খুব ভালো করেছো।

স্নিগ্ধা ছাদে গেলো।বুকের ভেতরে চেপে নিয়ে গেলো এক আকাশ শূন্যতা,এক পর্বত নিরবতা,অজানা অভিমানের ধূলিকণা।সেই শূন্যতা অদ্ভুত এক হাহাকারের বাতাসে পূর্ণ করে দিল তার নিশ্চুপ প্রেমিকের মন, আশঙ্কায় বুক কুঁকড়ে দিলো, উন্মাদনার মাদকতায় ভরিয়ে দিল চোখ।

রাফিন কফি শেষ করে নুডুলস খেলো, আধ গ্লাস পানি খেয়ে নিল। সিঁড়ি ভেঙে ছাদে উঠলো একটা ব্যর্থ ,অবসন্ন মস্তিষ্ক। মন আর মস্তিষ্কের দ্বন্দ্বে জয়ী হয়েছে মন।”আজ বলেই ফেলবো সব” এই ভেবেই পা চলছে।

স্নিগ্ধা কান্নায় আড়ষ্ট গলায় কি যেনো একটা গান গাইছিল।শেষ বিকেলের রোদে একটা টুইলাইট ইফেক্ট এনে দিল পুরো আকাশে,দিগন্তে আর বাতাসেও।এমন শুভ লগ্ন কি মিস করা চলে!
-স্নিগ্ধা।
-হুম।
-তোকে কিছু কথা বলার ছিল।
-আমি জানি কি বলবে।তবুও বলো।
-কি জানিস?
-তুমি আমায় ভালোবাসার কথা বলতে এসেছ।
-তুই!কি করে জানলি?
-তোমার চোখ বলেছে তুমি আমায় চাও।আর, মানুষ এই কথাটা সোজাসুজি বলতে পারে না।তাই,কামনা জাগলে ভালোবাসার কথা বলে।
-কিসব বলছিস?
-ভুল বললাম?
-অবশ্যই ।
-তবে বলো কেনো ভালোবাসো আমায়?
-জানিনা।
-জানার কথা ছিল।শোনো,আমি তোমায় ভালোবাসি কিনা তো আমি জানি না।তবে,তুমি তো প্রেমিক নও।তোমায় ভালোবাসা উচিত নয়।
-তুই আমায় বুঝলি না,স্নিগ্ধা।মানুষ মানুষের রূপে মুগ্ধ হয়, গুণে মুগ্ধ হয়।মানুষ মানুষকে চায়, সবচেয়ে কাছে।আমি জানি না কিভাবে বলবো।তোর মধ্যে কি জানি একটা আছে যা তোর রূপ, গুণ সবকিছুকে ছাপিয়ে যায়।আমায় টেনে আনে।শুধুই সেই কি জানি একটাকে অনুভব করতে।
-ভালোবাসার নাম করে আমায় ভেঙেচুরে ফেলবে না তো?
-কক্ষনো নারে পাগলী।
-আমি কিন্তু সত্যিই জানি না।
-জানতে হবে না। আর শোন,তোকে গড়বি তুই নিজে।অন্য কেউ নয়, জীবনে কখনোই এই অধিকারটা কাউকে দিবি না, আমাকেও না।কক্ষনো না,চাইলেও না। তুই একদিন জিজ্ঞেস করেছিলি না, স্বাধীনতা কি?এটাই স্বাধীনতা।

রাফিনের বুক পকেট ভিজে গেছে।সাঁঝের আলো জ্বলে উঠেছে।অচেনা পাখিগুলো বাড়ি ফিরছে।ভিজে গেছে স্নিগ্ধার মাথার তালুর চুল গুলো ও।ভিজুক।আজ অশ্রুর সাগর বয়ে যাক।জমে থাকা মেঘ কেটে যাক।ভালোবাসা খুব সচেতনভাবে জায়গা করে নিক বরং দু জনের চোখে,কণ্ঠে,মস্তিষ্কে।মনের আধিপত্য বরং গুড়িয়ে যাক।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button