ফিচার

করোনায় সম্ভাব্য অর্থনৈতিক মন্দার কবলে বাংলাদেশ

মোঃ হাবিবুর রহমান

শেয়ার করুনঃ

The Daily Narsingdir Bani

করোনা মহামারিতে অর্থনৈতিক মন্দার কবলে বিশ্ব। লকডাউনে স্থবির বৈশ্বিক অর্থনীতি। আর স্থবির অর্থনীতি ডেকে আনে অর্থনৈতিক মন্দাকে। করোনাভাইরাস অদৃশ্য ও অনেকটা উপসর্গবিহীন হলেও অর্থনৈতিক মন্দার উপসর্গ আমাদের মাঝে স্পষ্টতই দৃশ্যমান হয়েছে। জনস্বাস্থ্য ও বৈশ্বিক অর্থনীতির ওপর নেতিবাচক থাবা ভর করায় থমকে গেছে শিল্প-কারখানা, সেবাখাত এবং অপ্রাতিষ্ঠানিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড। তীব্র ঝুঁকির মধ্যে আজ মানুষের জীবন ও জীবিকা। কত মানুষ কর্মহীন, কোনো কোম্পানি বা প্রতিষ্ঠান কি পরিমাণ আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন, তা নির্ণয় করা না গেলেও মহামারীর এ দুর্যোগে অর্থনীতির সকল খাতই আজ ক্ষতিগ্রস্ত এটা নিশ্চিত করেই বলা যায়। প্রতিদিনই বাড়ছে আক্রান্ত আর কর্মহীন মানুষের সংখ্যা। চলমান সংকটে কমছে রাজস্ব আয়, বাড়ছে সরকারি ব্যয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশের ক্ষেত্রে সংক্রমণের চুড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছবে জুন-জুলাই মাসে। এরপর এ হার নিম্নমুখী হওয়ার আশঙ্কা করছেন দেখছেন তারা। তবে আমাদের অসচেতনতার মাশুল দিতে আর কতটা সময় এ পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হয় তা ভেবে দেখার বিষয়। অর্থনৈতিক ক্ষতি কাটিয়ে জীবন ও জীবিকার তাগিদে ৩১ মে, ২০২০ থেকে সরকার চলমান নিষেধাজ্ঞা শিথিল করে শর্ত সাপেক্ষে সকল অফিস, গণপরিবহন, দোকানপাট ও ব্যবসা বাণিজ্যের খাত সচল করতে নির্দেশনা জারি করেছে।

১৯৩০ সালে সংঘটিত মহামন্দাকে বিশ্ব অর্থনীতির পতনের উদাহরণ হিসেবে ব্যবহার করা হয়। ধনী ও দরিদ্র সব দেশেই সেই মহামন্দার বিধ্বংসী প্রভাব ছিল। ব্যক্তিগত আয়, কর, মুনাফা ও মুদ্রা মূল্যমানের ব্যাপক পতন ঘটে এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যর ৫০ শতাংশ কমে যায়। এছাড়া ২০০৮ সালে বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক মন্দার প্রভাব বাংলাদেশকে ছুঁতে পারেনি। কিন্তু ২০২০ সালে করোনা মহামারীর প্রভাব ইতোমধ্যে প্রতিটি রন্ধ্রে রন্ধ্রে প্রবেশ করেছে। তাই আসন্ন অর্থনৈতিক মন্দা আরও ভয়াবহ রূপ ধারণ করতে পারে বলে বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন।

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) বলছে, বিশ্বের অর্থনীতি ২০২০ সালে অন্তত তিন শতাংশ ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এই সংকটের ফলে আগামী দুই বছর ধরে বিশ্বের প্রবৃদ্ধি ৯ ট্রিলিয়ন ডলার কমে যেতে পারে। এছাড়া করোনাভাইরাসের কারণে সবকিছু স্থবির হয়ে যাওয়ায় বিশ্ব অর্থনীতি ৩ দশমিক ২ শতাংশ সংকুচিত হয়ে আসার শঙ্কা প্রকাশ করছে জাতিসংঘ। জাতিসংঘ উল্লেখ করেছে, ২০২০ সালের মধ্যভাগে উন্নত দেশগুলোর জিডিপি পাঁচ শতাংশ পর্যন্ত এবং উন্নয়নশীল দেশগুলোর জিডিপি ০.৭ শতাংশ পর্যন্ত কমে যেতে পারে। বিশ্ব সার্বিকভাবে ৮ দশমিক ৫ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার ক্ষতির মুখে পড়বে। এছাড়া আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার তথ্য মতে, বিশ্বের আড়াই কোটি মানুষ দ্রুতই চাকরি হারাবে।

বিশ্বব্যাংকের তথ্য মতে ২০২০ সালে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ৮.২ শতাংশ থেকে নেমে ২ বা ৩ শতাংশে দাঁড়াবে। এশিয় উন্নয়ন ব্যাংক এর তথ্যমতে, বাংলাদেশে আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ ৩.২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। অভ্যন্তরীণ চাহিদা কমে যাওয়ায় জিডিপির প্রবৃদ্ধি হ্রাস পেতে পারে। বিজিএমইএ নেতৃবৃন্দ জানিয়েছেন, গত দুই মাসে তিনশ কোটি ডলারের ক্রয়াদেশ বাতিল হয়েছে। এছাড়া বিশ্বব্যাংক বৈশ্বিক খতির প্রভাবে দক্ষিণ এশিয়ায় রেমিট্যান্স প্রবাহ ২২ শতাংশ পর্যন্ত নেমে যাওয়ার আশংকা করছে।

করোনার প্রথম ধাক্কায় সবচেয়ে বেশি বেসামাল অবস্থায় পড়ে অপ্রাতিষ্ঠানিক খাত। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্যমতে, প্রায় কোটি মানুষ খাতে নিয়োজিত রয়েছে। যাদের মধ্যে রয়েছে শ্রমিক, রিকশা ভ্যানচালক, হকার, পরিবহন হোটেল শ্রমিক, নির্মাণ শ্রমিক, ক্ষুদ্র দোকানদার ব্যবসায়ী। যাদের একদিন আয় না থাকলে পরিবারে খাদ্য সংকট দেখা দেয়। এছাড়া ক্ষতিগ্রস্তের তালিকায় আছে দারিদ্র সীমার নিচে বসবাসকারী জনগোষ্ঠী এবং বেকার সমাজ।

করোনার প্রভাবে মার্চের শুরু থেকে চলমান স্থবিরতায় পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও গণপরিবহন খাত। বাঙালির প্রধান দু’টি উৎসব পহেলা বৈশাখ ও ঈদুল ফিতরকে কেন্দ্র করে ব্যবসা-বাণিজ্য না হওয়ায় ব্যসায়ীরা মারাত্মক ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছেন। মানুষের ক্রয় ক্ষমতা হ্রাস, রাজস্ব আদায় বিঘ্নিত হওয়া, বেসরকারি বিনিয়োগ কমে যাওয়া, পর্যটন, হোটেল-মোটেল ও ক্যাটারিং সার্ভিস খাত, পণ্য সরবরাহ ও বাজারজাতকরণ ব্যবস্থা বেশি ক্ষতিগ্রস্ত। বেকারত্বের হার বৃদ্ধির ফলে সামাজিক অস্থিরতা বাড়বে ফলে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির ওপর চাপ বাড়বে। চলমান উন্নয়ন প্রকল্পের অগ্রগতির ধারা হ্রাস পাবে। আয় কমে যাওয়ায় মানুষের সঞ্চয় কমে যাবে। রেমিট্যান্স, শেয়ারবাজার, রপ্তানিমুখী শিল্প, ক্ষুদ্র, মাঝারী ও কুটির শিল্পের ওপর বিরূপ প্রভাব পড়েছে। ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও এনজিওগুলোর ঋণ খেলাপির হার বাড়বে। কৃষক তার উৎপাদিত পণ্য বাজারজাত করতে না পারায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এছাড়া উদ্বেগের সঙ্গে মানুষ দীর্ঘদিন ঘরে থাকার ফলে মানসিক স্বাস্থ্যের অবনতি হচ্ছে।

অর্থনৈতিক ক্ষতির চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় অগ্রাধিকার ভিত্তিক পরিকল্পনার প্রথম ধাপে সরকারের পক্ষ হতে মানুষের জীবন বাঁচানোর ওপর গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। রোগ নির্ণয়, চিকিৎসা ব্যবস্থা ও মানুষের সচেতনতার ওপর জোর দেয়া হয়েছে। দ্বিতীয় ধাপে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মাঝে খাদ্য ও ত্রাণ সরবরাহ পোঁছে দেয়া হচ্ছে। সরকারি উদ্যোগে এ পর্যন্ত প্রায় ৬ কোটি মানুষ খাদ্য সহায়তা ও ত্রাণ সরবরাহের সুবিধা পেয়েছে। এ পর্যন্ত ১.৮৫ লাখ টন চাল ও ১১১ কোটি টাকার নগদ সহায়তা প্রদান করা হয়েছে। পরিকল্পনার শেষ ধাপে উন্নয়ন সহযোগী দেশ ও সংস্থাসমূহ হতে বাজেট সহায়তা বৃদ্ধি, বিনিয়োগ বৃদ্ধি ও কর্মসস্থানের পথ সুগম করে অর্থনীতির ক্ষতি কাটিয়ে পুনরুদ্ধারের চেষ্টা অব্যাহত আছে। ইতোমধ্যে সরকার অর্থনীতি পুনরুদ্ধারে এ পর্যন্ত সব মিলিয়ে মোট ১১ দশমিক ৯০ বিলিয়ন ডলারের ১৮টি প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছে, যা দেশের মোট জিডিপির ৩ দশমিক ৬ শতাংশ। এছাড়া সামাজিক সুরক্ষা খাতসহ বিবিধ প্রণোদনা প্যকেজ ঘোষণা করে সরকারের ব্যয় বৃদ্ধির পরিকল্পনা রয়েছে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্যমতে, করোনা সহজেই আমাদের মাঝ থেকে বিদায় নিচ্ছে না অথবা দ্বিতীয় পর্যায়ে আবার ফিরে আসতে পারে। তাই করোনায় সৃষ্ট অর্থনৈতিক মন্দা থেকে উত্তরণ সহসাই হবে না। এজন্য বিশেষজ্ঞরা অর্থনৈতিক মন্দার মডেল ইংরেজি “V” অক্ষরের মতো হঠাৎ করেই ধস নামার পর আবার দ্রুতই লাফিয়ে চুড়ায় উঠার সম্ভাবনা দেখছেন না। বিশ্বে ধনী রাষ্ট্রগুলোর সংস্থা- অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও উন্নয়ন সংস্থার (OECD) মতে, অর্থনীতি পুনরুদ্ধারে ইংরেজি “V” নয় বরং “U” অক্ষরের মতো হবে। অর্থ্যাৎ অর্থনীতি রাতারাতি ফিরবে না। মন্দার প্রভাব তলানীতে বেশ কিছুটা সময় অবস্থান করার পরই স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরবে।

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) এর এপ্রিল, ২০২০ প্রকাশিত রিপোর্ট মতে, ২০১৯ সালে বিশ্বের প্রায় সব রাষ্ট্রেরই জিডিপির ঊর্ধমুখী প্রবৃদ্ধির হার লক্ষ্য করা গেছে। ২০২০ সালে বিশ্বের সামগ্রিক প্রবৃদ্ধির হার নিম্নমুখী হবে যা. শতাংশ। তবে, বৈশ্বিক মহামারীর সময়েও বাংলাদেশের ক্ষেত্রে ২০২০ সালে প্রবৃদ্ধির হার % ধরা হয়েছে এবং ২০২১ সালে দ্রুতই অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়িয়ে হার . শতাংশে রেকর্ড স্পর্শ করবে মর্মে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। উল্লেখ্য, চলতি অর্থবছরের বাজেটে দশমিক ২০ শতাংশ অর্থনীতির কলেবর বৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা অনুমান করা হয়েছিল।

লন্ডনভিত্তিক গণমাধ্যম দি ইকোনমিস্ট জানায়, কোভিড-১৯ মূলত জনগণের চলাচল বন্ধ করে, রপ্তানি আয়ে ধস সৃষ্টি করে এবং বিদেশি পুঁজি প্রবাহে বাধা সৃষ্টির মাধ্যমে অর্থনৈতিক মন্দাকে ডেকে আনছে। তাদের প্রস্তুত করা ওয়াকিংএ জিডিপির তুলনায় গৃহীত ঋণ, সরকারি ও বেসরকারি খাতে মোট বৈদেশিক ঋণ এবং বৈদেশিক মুদ্রা ও সম্পদের রিজার্ভ বিবেচনা করা হয়েছে। তারা উল্লেখ করেন, বিশ্ব মহামারির সংকটেও সুরক্ষিত অর্থনীতিতে নবম অবস্থানে রয়েছে বাংলাদেশ। এমনকি চীন ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের অর্থনীতির চেয়েও কম ঝুঁকিতে আছে বাংলাদেশ। এটি আশার খবর হলেও অর্থনীতির ক্ষতির ধাক্কা কত দ্রুত সামলে উঠতে পারি সেই চ্যালেঞ্জ আমাদের সামনে। অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার পরিকল্পনার জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ বিশ্বব্যাংক, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল ও এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক বা এডিবির গঠিত তহবিল থেকে অর্থ পেতে পারা। ফলে দেশে মুদ্রা সরবরাহ বৃদ্ধি পাবে। আলোচ্য ওয়াকিংয়ে ভারত, পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কার অবস্থান যথাক্রমে; ১৮, ৪৩ ও ৬১তম।

স্বাস্থ্য-সুরক্ষার নিরাপদ ব্যবস্থা, প্রতিষেধক টিকা বা ওষুধ আবিষ্কার এবং সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্ঠনীর সম্প্রসারণ, ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য তারল্য বৃদ্ধি ও ঋণ সরবরাহ বাড়ানো, সামষ্টিক অর্থনীতির ক্ষেত্রে সম্প্রসারণ নীতি, ব্যাংকের তারল্য বাড়ানো, মুদ্রানীতির ব্যবস্থাপনা ও সরকারি বিনিয়োগ বৃদ্ধির উদ্যোগ গ্রহণ করে সমসাময়িক ইতিহাসের সবচেয়ে কঠিন এই সংকট মোকাবেলা করা সম্ভব হবে। এ জন্য প্রয়োজন রাষ্ট্রগুলোর পারস্পারিক সহযোগিতা, ঐক্যবদ্ধতা ও সমন্বিত অর্থনৈতিক পুনর্গঠন পরিকল্পনা।

লেখক:মো. হাবিবুর রহমান উপসচিব, বাংলাদেশ সরকার।

One Comment

  1. যারা সুদে ঋন নেওয়া হারাম জানে, তারা কিভাবে ঋন পাবে? মুসলমান ব্যবসায়ীদের সুদবিহীন ঋন দেওয়া সরকারের একান্ত বিবেচ্য হওয়া আবশ্যক।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button