অপরাধজাতীয়নরসিংদী সদরনরসিংদীর খবর

পাপিয়া-সুমনের অপরাধ সাম্রাজ্য কার ছত্রছায়ায়- এমন প্রশ্ন নরসিংদীবাসীর

শেয়ার করুনঃ

The Daily Narsingdir Baniবাণী রিপোর্ট : নরসিংদী যুব মহিলা লীগের সদ্য বহিস্কৃত সাধারণ সম্পাদক শামিমা নুর পাপিয়া ওরফে পিউ ও মফিজুর রহমান সুমন কার ছত্রছায়ায় এতবড় অপরাধ সম্রাজ্যের অধিপতি এমন প্রশ্ন এখন নরসিংদীবাসীর মুখে মুখে। চায়ের আড্ডা, দোকান-পাট এমনকি বাড়ী ঘরে পর্যন্ত এ আলোচনা সমালোচনা চলছে। রাজনীতির আড়ালে কীভাবে বিস্তার ঘটিয়েছে তাদের অপরাধ কার্যক্রম নরসিংদীর আপামর জনগণ তা বিচার বিশ্লেষণ করছে।

নরসিংদী যুব মহিলা লীগের সদ্য বহিস্কৃত সাধারণ সম্পাদক শামিমা নুর পাপিয়া ও মফিজুর রহমান সুমন দম্পত্তি প্রকৃতপক্ষে তেমন আলোচনায় ছিল না এলাকায়। দীর্ঘ দিন নরসিংদীতে সক্রিয় ভাবে না থাকায় তাদের এই অপরাধের বিষয়ে অজানা স্থানীয় এলাকাবাসীসহ তাদের ঘনিষ্টদের। পাপিয়া-সুমন দম্পত্তির বাল্যবন্ধু, আত্মীয় স্বজনসহ এলাকার লোকজনের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।
গত শনিবার বেলা সাড়ে ১১টার দিকে শাহজালাল বিমানবন্দর থেকে দেশ থেকে পালানোর সময় পাপিয়া, সুমন ও তাদের দুই সহযোগী সাব্বির খন্দকার, শেখ তৈয়বাকে গ্রেপ্তার করেছে র‌্যাব-১। তাদের বিরুদ্ধে অবৈধ সম্পদ অর্জন ও পাচার, জাল নোট সরবরাহ, মাদক, অস্ত্র, নারীদের দিয়ে অনৈতিক ব্যবসা ও চাঁদাবাজির অভিযোগ রয়েছে তাদের বিরুদ্ধে। এ ঘটনায় যুব মহিলা লীগের কেন্দ্রীয় সংসদ নরসিংদী জেলা যুব মহিলা লীগের পদ থেকে আজীবনের জন্য বহিস্কার করা হয়। পাশাপাশি তাদের বিরুদ্ধে তেজগাঁও থানায় অস্ত্র ও মাদক এবং বিমানবন্দর থানায় জাল মুদ্রা রাখার অভিযোগে পৃথক তিনটি মামলা দায়ের করা হয়। এসব মামলায় পাপিয়া ও সুমনকে ১৫ দিনের রিমান্ড এবং বাকি দুজনকে ৫ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছে আদালত।
সুমন ও পাপিয়ার উত্থান নিয়ে আওয়ামী লীগের দলীয় নেতাকর্মী, এলাকাবাসী ও সুমনের বাল্য বন্ধুসহ কমপক্ষে ২০ জন জানান, ১৯৯৬ সালে ব্রাহ্মন্দী কে.কে. বালক উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি পাস করার পর নরসিংদী সরকারি কলেজে গিয়েই ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত হন সুমন। রাজনীতির পাশাপাশি শৈশব থেকেই চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাসী কর্মকা-ে সম্পৃক্ত ছিলেন। ২০০১ সালে নরসিংদী পৌরসভার কমিশনার মানিক মিয়াকে যাত্রা প্যান্ডেলে গিয়ে হত্যার অভিযোগ রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে। ওই হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় দায়ের হওয়া মামলার এজাহারভুক্ত (মামলা নং-১(১)২০০১) আসামি ছিলেন তিনি। হত্যাকান্ড ও সন্ত্রাসী কর্মকান্ডের উপর ভর করেই অপরাধ জগতে তাঁর উত্থান। তবে কলেজ জীবন থেকেই ছিল তাঁর অস্ত্র চালানোর প্রতি নেশা। তাই পরবর্তীতে শুটিং ক্লাবের সদস্য হয়ে বিভিন্ন কোর্স সম্পন্ন করেন। এক সময় যখন অস্ত্র চালানো তাঁর নেশায় পরিণত হয় তখন অনেক রাজনৈতিক নেতার সঙ্গে তাঁর সখ্যতা গড়ে উঠে। এক সময় তিনি নরসিংদী শহর ছাত্রলীগের আহ্বায়কও নির্বাচিত হন। এরইমধ্যে দীর্ঘদিন প্রেমের সম্পর্কের পর ২০০৯ শহরের ভাগদী এলাকার সাইফুল বারীর মেয়ে শামিমা নুর পাপিয়াকে বিয়ে করেন সুমন। বিয়ের পরপরই ২০১২ সালে সন্ত্রাসী হামলার শিকার হন এই দম্পত্তি। সেই হামলায় পাপিয়া গুলিবিদ্ধ হন। পরে তারা নরসিংদী ছেড়ে পাড়ি জমান ঢাকায়। তারপর নরসিংদী থেকে অনেকটা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন তারা। পরবর্তীতে ঢাকার সাবেক এক নারী সাংসদ (সাবিনা আক্তার তুহিন) ও যুব মহিলা লীগের কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দের সঙ্গে তাদের সখ্যতা গড়ে ওঠে। ২০১৪ সালে হঠাৎ নরসিংদী জেলা যুব মহিলা লীগের সাধারণ সম্পাদকের পদ বাগিয়ে এনে আলোচনায় আসেন পাপিয়া।

The Daily Narsingdir Baniকিন্তু জেলা আওয়ামী লীগের নেতৃবৃন্দের সঙ্গে সমন্বয় না করেই আকষ্মিক রাজনীতিতে আসা পাপিয়াকে এত বড় পদ দেওয়ায় ক্ষুব্ধ ছিল জেলা আওয়ামী লীগের নেতৃবৃন্দ। তাই তারা নরসিংদীতে দলের কোনো কর্মসূচিতে অংশও নিতে পারতেন না। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে পাপিয়া তার কর্মীদের নিয়ে নরসিংদী শহর এলাকায় বর্তমান এমপি’র পক্ষে প্রচারণা চালাতে দেখা গেছে। নির্বাচনের পর থেকে নরসিংদী জেলা আওয়ামী লীগ দুই ধারায় বিভক্ত। এর এক পক্ষের নেতৃত্ব দিচ্ছেন জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মো. নজরুল ইসলাম ও অন্য পক্ষের নেতৃত্ব দিচ্ছেন সাধারণ সম্পাদক আবদুল মতিন ভূঞা। দলীয় কোন্দলের এই সুযোগে জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সদরের সাংসদ নজরুল ইসলামের বলয়ে যোগ দিয়ে অধিক সক্রিয় হয়ে উঠেন সুমন ও পাপিয়া। নিজেদের জানান দিতে আওয়ামী লীগের বিভিন্ন কর্মসূচিতে মো. নজরুল ইসলামের পক্ষে সুমন ও পাপিয়ার নেতৃত্বে বিভিন্ন মিটিং মিছিলে বিশাল শোডাউন করেন। এরই মধ্যে অল্প কয়েকদিনের মধ্যে নরসিংদীতে গড়ে তোলেন “কিউ এন্ড সি” নামের একটি ক্যাডার বাহিনী। এই বাাহিনীর প্রত্যেকের হাতে রয়েছে ‘কিউ এন্ড সি’র ট্যাটু। এই বাহিনীর বেশির ভাগ সদস্যকে সুমন ও পাপিয়ার পক্ষ থেকে মোটর সাইকেল কিনে দেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে। তারা এসব মোটর সাইকেল নিয়ে এমপির পক্ষে বিভিন্ন দলীয় কর্মসূচিতে বিশাল শোডাউন করেন। তাদের এসব মোটর সাইকেল রক্ষনাবেক্ষণ এবং নিয়মিত বসার জন্য কে. এম. সি কার ওয়াশ এন্ড অটো সলিউশন নামের একটি প্রতিষ্ঠান করেন পাপিয়া। ২০১৯ সালের ২২ অক্টোবর নরসিংদী পৌরসভা থেকে যন্ত্রাংশ বিক্রয় ব্যবসার ধরন দেখিয়ে কে এম সি কার ওয়াশ অটো সলিউশন নামের প্রতিষ্ঠানের ট্রেড লাইসেন্স নেন শামিমা নুর পাপিয়া। সর্বশেষ জেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সভাপতি ও জেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান প্রয়াত এ্যাডভোকেট আসাদোজ্জামানের স্মরণ সভায় বিশাল শোডাউন করেন। স্থানীয় রাজনীতিতে বর্তমানে তারা জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সদরের সাংসদ মো. নজরুল ইসলামের সমর্থক হিসেবে পরিচিত।
র‌্যাবের কাছে স্বীকার করা অপরাধসমূহ স্থানীয়দের জানা না থাকলেও সম্প্রতি আঙ্গুল ফুলে কলা গাছ হওয়ার বিষয়টি নজর কাড়ে সবার। কিন্তু স্থানীয় সাংসদের আস্থাবাজন হওয়ায় এবং তাদেও নিজস্ব ক্যাডার বাহিনীর ভয়ে কৌতুহল থাকলেও বেশী কিছু জানার আগ্রহ প্রকাশ্যে কেউ আনেননি। তবে র‌্যাবের হাতে গ্রেপ্তার হওয়ার পর রাষ্ট্রপতি থেকে শুরু করে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় বিভিন্ন নেতৃবৃন্দসহ, স্থানীয় সাংসদ ও তাঁর অনুসারীদের সঙ্গে বিভিন্ন ছবি ভাইরাল হওয়া নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে।
নরসিংদী পৌর মেয়র ও শহর আওয়ামী লীগের সভাপতি মো. কামরুজ্জামান বলেন, সদর এমপিই সুমন ও পাপিয়াকে ঢাকায় বিভিন্ন উচ্চ পর্যায়ের নেতাদের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিতেন। যা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে।
নরসিংদী জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান আবদুল মতিন ভূঞা বলেন, সুমনের বিভিন্ন অপরাধ মূলক কর্মকান্ডের কারণে তাকে নরসিংদী থেকে বিতারিত করা হয়েছিল। এতদিন সে আসতে পারেনি। সম্প্রতি জেলা আ.লীগের সভাপতি জনবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ায় নিজের অস্তিত্ব রক্ষায় দলীয় পদকে পুঁজি করে সুমন পাপিয়ার মত সন্ত্রাসী, অস্ত্রবাজদের নরসিংদীতে পুনরায় আমদানি করছেন। যা খুবই দুঃখজনক। তাঁর এই মন্তব্যে এক মত পোষন করেন স্থানীয় পৌর মেয়র ও শহর আওয়ামী লীগের সভাপতি মো. কামরুজ্জামান, জেলা যুবলীগ, জেলা মহিলা আওয়ামী লীগ, জেলা শ্রমিক লীগ, ছাত্রলীগ, সেচ্ছাসেবক লীগসহ আওয়ামী লীগের বিভিন্ন নেতৃবৃন্দ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button