অপরাধআইন-আদালতজাতীয়নরসিংদী সদর

হলিউড-বলিউডের আন্ডারওয়ার্ল্ড থেকেও বাস্তবে ভয়ংকর পাপিয়া ও মতি সুমন

শেয়ার করুনঃ

The Daily Narsingdir Bani

বাণী ডেস্ক : হলিউড বলিউডের ছবিতে খলচরিত্রে নারীদের হরহামেশাই দেখা যায়। সেখানে তারা নানা অপকর্মে নিজেদের চরিত্র ধারণ করেন। জড়িত থাকেন আন্ডাওয়ার্ল্ডের সঙ্গে। কিন্তু এবার সেসবকে বাস্তবেই হার মানালো নরসিংদীর শামীমা নূর পাপিয়া। মাদক থেকে শুরু করে অসহায় নারীদেরকে দেহ ব্যবসায় বাধ্য করা পাপিয়া যেন ছবির চরিত্রের থেকেও ভয়ংকর!

সুন্দরী নারীদের নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে অনৈতিক ব্যবসা করে আসছিলেন পাপিয়া। সেসবের ভিডিও ধারণ করে বিভিন্ন জনকে ব্লাকমেইলও করতেন। এরইমধ্যে অবৈধভাবে তিনি কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন। রাজধানীর অভিজাত একটি হোটেলে তিন মাসে তার খরচ ১ কোটি ৩০ লাখ টাকা। প্রতিদিন শুধু বারের খরচবাবদ প্রায় আড়াই লাখ টাকা পরিশোধ করতেন পাপিয়া।

হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে গত শনিবার দেশত্যাগের সময় পাপিয়াসহ চারজনকে গ্রেফতার করে র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‌্যাব)। আটক অন্যরা হলেন- পাপিয়ার স্বামী মফিজুর রহমান ওরফে সুমন চৌধুরী ওরফে মতি সুমন (৩৮), সাব্বির খন্দকার (২৯) ও শেখ তায়্যিবা (২২)। তাদের বিরুদ্ধে অবৈধ অস্ত্র ও মাদক ব্যবসা, চাঁদাবাজি, অনৈতিক কর্মকাণ্ড, জাল নোট সরবরাহ, রাজস্ব ফাঁকি, অর্থ পাচারসহ নানা অপরাধের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে। মতি সুমন একসময় নরসিংদীর অপরাধ জগতের একজন হিসেবে পরিচিত ছিল। তার বিরুদ্ধে একাধিক মামলা রয়েছে। এখন তাকে নরসিংদীতে কমই দেখা যায়। ২/৩ বছরের মাঝেই সে যেন আঙ্গুল ফুলে কলাগাছ বনে গেছে। পেয়েছে আলাদিনের চেরাগ।

গ্রেফতারের সময় তাদের কাছ থেকে সাতটি পাসপোর্ট, ২ লাখ ১২ হাজার ২৭০ টাকা, ২৫ হাজার ৬০০ টাকার জাল নোট, ৩১০ ভারতীয় রুপি, ৪২০ শ্রীলংকান রুপি, ১১ হাজার ৯১ ইউএস ডলার ও সাতটি মুঠোফোন জব্দ করা হয়। তাদের কাছে বিদেশি পিস্তল, ম্যাগাজিন ও গুলিও পাওয়া যায়।

পরের দিন রোববার ভোররাত চারটার দিকে শামীমা নূর ও তার স্বামী মফিজুর রহমান ওরফে সুমনের দেয়া তথ্যের ভিত্তিতে অভিযান চালিয়ে র‍্যাব সম্পদের হদিস পায়। এর মধ্যে টাকা পাওয়া গেছে ৫৮ লাখ ৪১ হাজার।

কারওয়ান বাজারে র‌্যাবের মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে র‍্যাব-১–এর অধিনায়ক শাফি উল্লাহ বুলবুল বলেন, শামীমা নূরের আয়ের সঙ্গে ব্যয়ের কোনো সংগতি নেই। হোটেল ওয়েস্টিনে তাদের নামে বুকিং দেয়া বিলাসবহুল প্রেসিডেনশিয়াল স্যুইট এবং ইন্দিরা রোডের ফ্ল্যাট থেকে র‍্যাব ৫৮ লাখ ৪১ হাজার টাকা উদ্ধার করেছে। এর বাইরেও উদ্ধার হয়েছে একটি বিদেশি পিস্তল, দুটি পিস্তলের ম্যাগাজিন, পিস্তলের ২০টি গুলি, পাঁচ বোতল দামি বিদেশি মদ, পাঁচটি পাসপোর্ট, তিনটি চেকবই, কিছু বিদেশি মুদ্রা, বিভিন্ন ব্যাংকের ১০টি ভিসা ও এটিএম কার্ড।

সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, অনুসন্ধানে র‍্যাব শামীমা নূর এবং তার স্বামী মফিজুর রহমানের মালিকানায় ইন্দিরা রোডে বিলাসবহুল দুটি ফ্ল্যাট, নরসিংদীতে দুটি ফ্ল্যাট ও দুই কোটি টাকা দামের দুটি প্লট, তেজগাঁওয়ে এফডিসি ফটকের কাছে কার এক্সচেঞ্জ নামের গাড়ির শো রুমে এক কোটি টাকার বিনিয়োগ ও নরসিংদী জেলায় ‘কেএমসি কার ওয়াশ অ্যান্ড অটো সলিউশন’ নামের প্রতিষ্ঠানে ৪০ লাখ টাকা বিনিয়োগের হদিস পেয়েছে। এ ছাড়া শামীমা নূর পুলিশের পরিদর্শক পদ ও বাংলাদেশ রেলওয়েতে বিভিন্ন পদে চাকরি দেয়ার নামে ১১ লাখ টাকা, কারখানায় অবৈধ গ্যাস–সংযোগ দেয়ার কথা বলে ৩৫ লাখ টাকা, সিএনজি পাম্পের লাইন করে দেয়ার কথা বলে ২৯ লাখ টাকাসহ ঢাকা ও নরসিংদী এলাকায় চাঁদাবাজি, মাদক ও অস্ত্র ব্যবসা করে কোটি টাকা উপার্জন করেছেন বলেও দাবি করেছে র‍্যাব।

এর আগে শাফি উল্লাহ বুলবুল আরো বলেন, পাপিয়া সমাজসেবার নামে নরসিংদী এলাকায় অসহায় নারীদের আর্থিক দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে তাদেরকে অনৈতিক কাজে লিপ্ত করতেন। এজন্য অধিকাংশ সময় নরসিংদী ও রাজধানীর বিভিন্ন বিলাসবহুল হোটেলে অবস্থান করে অনৈতিক কাজে নারী সরবরাহ করে আসছিলেন।

পাপিয়া গত তিন মাসে রাজধানীর একটি অভিজাত হোটেলে ১ কোটি ৩০ লাখ টাকা বিল পরিশোধ করেছেন জানিয়ে শাফী উল্লাহ বুলবুল বলেন, ওই হোটেলে প্রতিদিন শুধু বারের খরচবাবদ প্রায় আড়াই লাখ টাকা পরিশোধ করতেন পাপিয়া। সেখানে তার নিয়ন্ত্রণে ৭টি মেয়ের কথা জানা গেছে, যাদেরকে তিনি প্রতি মাসে ৩০ হাজার করে মোট ২ লাখ ১০ হাজার টাকা পরিশোধ করতেন।

নরসিংদী এলাকায় চাঁদাবাজির জন্য তার একটি ক্যাডার বাহিনী রয়েছে। স্বামীর সহযোগিতায় অবৈধ অস্ত্র, মাদক ও চাঁদাবাজির মাধ্যমে স্বল্প সময়ের মধ্যে তিনি নরসিংদী ও ঢাকায় একাধিক বিলাসবহুল বাড়ি-গাড়িসহ বিপুল পরিমাণ অর্থের মালিক হয়েছেন। এছাড়া তিনি বিভিন্ন ধরনের তদবির বাণিজ্যের সঙ্গে জড়িত।

আটক মতি পেশায় একজন ব্যবসায়ী। দেশে স্ত্রীর ব্যবসায় সহযোগিতার পাশাপাশি থাইল্যান্ডে তার বারের ব্যবসা রয়েছে। তিনি স্ত্রীর মাধ্যমে প্রত্যন্ত অঞ্চলের অসহায় নারীদের অনৈতিক কাজে ব্যবহার করেন। অবৈধ অস্ত্র, মাদক ব্যবসা, চাঁদাবাজিসহ বিভিন্ন অপরাধের সঙ্গে তিনি জড়িত।

আটক সাব্বির খন্দকার পাপিয়ার ব্যক্তিগত সহকারী এবং আটক তায়্যিবা মতি সুমনের ব্যক্তিগত সহকারী হিসেবে কাজ করতেন। পাপিয়া ও মতি সুমনের ব্যক্তিগত সম্পত্তির হিসাব রক্ষণাবেক্ষণসহ সকল অবৈধ ব্যবসায় এবং অর্থ পাচার ও রাজস্ব ফাঁকি দিতে তারা সহযোগিতা করে আসছিলেন বলে জানায় র‌্যাব।

পাপিয়া ও সুমন সম্পর্কে স্থানীয় রাজনীতিবিদ ও এলাকাবাসীর সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ২০০০ সালের দিকে নরসিংদী শহর ছাত্রলীগের সাবেক আহ্বায়ক মফিজুর রহমান চৌধুরী সুমনের উত্থান শুরু। শৈশব থেকেই চাঁদাবাজি সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড ও ব্ল্যাকমেইল ছিল সুমনের প্রধান পেশা। দূরদর্শী চতুর ও মাস্টারমাইন্ড সুমন রাজনীতিবিদদের সঙ্গে সখ্য গড়ে তোলেন। ২০০১ সালে পৌরসভার কমিশনার মানিক মিয়াকে যাত্রা প্যান্ডেলে গিয়ে হত্যার পর তিনি আলোচনায় আসেন। এরই মধ্যে পাপিয়া চৌধুরীকে বিয়ে করেন সুমন। এরপর তার স্ত্রী পাপিয়াকে রাজনীতিতে কাজে লাগান। প্রয়াত মেয়র লোকমান হোসেন হত্যাকাণ্ডের পর দুর্বৃত্তায়ন রোধকল্পে বর্তমান মেয়র কামরুজ্জামান কামরুল সন্ত্রাসী সুমন ও তার স্ত্রী পাপিয়া চৌধুরীকে আওয়ামী লীগের কর্মকাণ্ডে আসতে নিষেধ করেন। পরে স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতৃত্বের বিভাজনকে কেন্দ্র করে পাপিয়া চৌধুরী ও তার স্বামী মফিজুর রহমান চৌধুরী সুমন রাজনীতিতে প্রভাব বিস্তার করে ২০১৪ সালের ১৩ ডিসেম্বর জেলা যুব মহিলা লীগের সম্মেলনে তৌহিদা সরকার রুনা সভাপতি ও পাপিয়া চৌধুরী সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। সম্প্রতি আওয়ামী লীগের সাবেক সভাপতি ও জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান প্রয়াত নেতা আসাদুজ্জামানের স্মরণসভায় বিশাল শোডাউন আর শত শত লোক নিয়ে আওয়ামী লীগের প্রতিটি মিছিল ও সভায় তারা যোগ দেন। এছাড়া স্থানীয় এমপির সভা-সমাবেশে তাদের সরব উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়।

সূত্র জানায়, পাপিয়ার শেল্টারদাতা সংসদ সদস্যের সঙ্গে পাপিয়ার বিভিন্ন সময়ের ছবি ফেসবুকে ভাইরাল হওয়ার পর রীতিমতো দলীয় পরিমন্ডলেও তুলাধুনা হচ্ছেন ওই সংসদ সদস্য। কেন এবং কী কারণে তিনি অনৈতিক কর্মকান্ডে সম্পৃক্ত পাপিয়াকে আশ্রয়-প্রশ্রয় দিয়েছেন এ নিয়েও নানা প্রশ্নের ডালপালা বিস্তার করছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button