নরসিংদীর খবরনরসিংদী সদর

নরসিংদী জেলা পূজা উদযাপন পরিষদের অকার্যকর কমিটির নেতৃত্ব ধরে রেখেছে মামলার আসামীরা

শেয়ার করুনঃ

The Daily Narsingdir Bani

বাণী রিপোর্ট: মামলার আসামীদের দখলে নরসিংদী জেলা পূজা উদযাপন পরিষদের বর্তমান অকার্যকর কমিটি। মেয়াদ উত্তীর্ণ অকার্যকর কমিটি দিয়ে চলছে নরসিংদী জেলা পূজা উদযাপন পরিষদ। সভাপতি প্রফেসর সূর্যকান্ত দাস, সাধারণ সম্পাদক দীপক কুমার সাহা ও মহিলা বিষয়ক সম্পাদিকা ইতি রানী পাল একাধিক মামলার আসামী। তাদের একজনের বিরুদ্ধে রয়েছে একাধিক গ্রেফতারী পরোয়ানা। মামলা থেকে বাঁচতে ও গ্রেফতার এড়াতে তারা পূজা উদযাপন পরিষদের নাম ভাঙিয়ে ফায়দা লুটে যাচ্ছে। তাদের অনৈতিক কার্যকলাপের বিরুদ্ধে মুখ খুলতে শুরু করেছেন হিন্দু ধর্মাবলম্বী বিভিন্ন কমিটির নেতৃবৃন্দ ও সাধারণ সদস্যরা। পদ থেকে অবিলম্বে সরে না দাড়ালে সভপতি-সাধারণ সম্পাদকসহ তাদের সহযোগীদের বিরুদ্ধে কেন্দ্রীয় কমিটিতে লিখিত অভিযোগ এবং গঠনতন্ত্র অনুযায়ী আইনের আশ্রয় নেয়ার কথা জানিয়েছেন হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা।
পূজা উদযাপন পরিষদের সভাপতি সূর্যকান্ত দাসের বিরুদ্ধে রয়েছে ঢাকা মূখ্য মহানগর ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে সিআর মামলা নং ১২০/১৮, ধারা ৩৬৫, ৩৮৫, ৩৮৬, ৩৮৮। তিনি জেলা দুর্ণীতি প্রতিরোধ কমিটির সভাপতি হওয়া সত্বেও গঠনতন্ত্র অনুযায়ী মেয়াদোত্তীর্ণ অকার্যকর নরসিংদী জেলা পূজা উদযাপন পরিষদের সভাপতির পদ আগলে রেখেছেন। একাধিক গণমাধ্যমে এ সংক্রান্ত সংবাদ প্রকাশিত হওয়ার পরও পদ থেকে সরে দাড়ানোসহ নতুন কমিটি গঠনে উদ্যোগী হচ্ছেন না।
পূজা উদযাপন পরিষদের সাধারণ সম্পাদক দীপক কুমার সাহা, তার বিরুদ্ধে বিজ্ঞ চীফ জ্যুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত, নরসিংদীর সিআর মামলা নং ৩০৮/১৯, ধারা ৫০০ এবং ঢাকা মূখ্য মহানগর ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে সিআর মামলা নং ১২০/১৮, ধারা ৩৬৫, ৩৮৫, ৩৮৬, ৩৮৮। এছাড়া দীপক সাহার বিরুদ্ধে অন্যের বাড়ী দখল করার অভিযোগ রয়েছে। সূত্র জানায়, দীপক সাহা নরসিংদী শহরের এক ধনাঢ্য ব্যবসায়ীর বাড়ী ভাড়া নিয়ে তা জবর দখল করে রাখে। বাড়ীর মালিককে কোন ভাড়া প্রদান করছে না। ১৯৯৫ সাল থেকে এ পর্যন্ত প্রায় ২৫ বছর যাবত বাড়িটি জোরপূর্বক দখলে রেখে অবৈধভাবে বসবাস করছে। পেশি শক্তির মাধ্যমে দখলে রাখা বাড়ী থেকে অবৈধ দখলদার দীপক সাহাকে উচ্ছেদ করতে বাড়ীর মালিক ব্যবসায়ী আদালতে মামলা দায়ের করেছে। এসব অপকর্ম ঢাকতে সে পুজা উদযাপন পরিষদের সাধারণ সম্পদকের পদ কৌশলে আগলে রেখেছেন।
বিভিন্ন অফিস আদালতে তার পদ পদবী ব্যবহার করে প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তাদের অনুকম্পা পেতে নিজেকে ধর্মীয় নেতা হিসেবে জাহির করছেন। তার অপকর্মের সহযোগী ও তার পক্ষে সাফাই গেয়ে থাকেন নরসিংদী পৌসভার একজন সাবেক কমিশনার।
এছাড়াও দীপক সাহার বিরুদ্ধে রয়েছে জেলা পুজা উদযাপন পরিষদের তহবিল তছরুপের অভিযোগ। সংশ্লিষ্টরা জানায়, বিগত প্রায় ৪বছর যাবত জেলা কমিটির সদস্য, থানা কমিটির নিকট থেকে আদায়কৃত বাৎসরিক চাঁদার কোন হিসেব তিনি উপস্থাপন করছেন না। হিসেব নিকেশ দিতে হবে বিধায় তিনি এ পর্যন্ত একটি কার্যকরী পরিষদ এর মিটিং এবং সাধারণ সভা পর্যন্ত করেনি। কোন প্রকার জবাবদিহিতা নেই তার।
পূজা উদযাপন পরিষদের মহিলা বিষয়ক সম্পাদিকা ইতি রানী পালের বিরুদ্ধে রয়েছে চীফ জ্যুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত, নরসিংদীর মামলা নং ৭৯২/১৮, ধারা ৪৬৭, ৪৬৮, ৪৭১, ৩৮৫, ৩৪। ঢাকা মূখ্য মহানগর ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে সিআর মামলা নং ১২০/১৮, ধারা ৩৬৫, ৩৮৫, ৩৮৬, ৩৮৮। চীফ জ্যুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত, নরসিংদীর মামলা নং ৮৬৩/১৮, ধারা ১৪৩, ১০৯, ৩৬৬, ৩৮৫, ৫০৬। এছাড়াও তার বিরুদ্ধে নরসিংদী সদর মডেল থানায় রয়েছে একাধিক সাধারণ ডাইরী যার নং ৩১১, তাং ০৬/০৬/১৮, ১৬৭৭, তাং ২৯/০৫/১৮। একাধিক গ্রেফতারী পরোয়ানা থাকা সত্বেও এসকল মামলার আসামীরা গ্রেফতার হুেচ্ছনা।
এসব মামলার আসামীরা আগলে রেখেছেন পূজা উদযাপন পরিষদের মতো হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের সর্ববৃহৎ সংগঠন। তারা পরিষদের এসব পদের নাম ভাঙ্গিয়ে নিজেদের অপকর্ম ঢাকতে তৎপরতা চালাচ্ছে। মেয়াদোত্তীর্ণ হওয়ার পরও তারা পদের লোভ ছাড়তে পারছেননা। নেতৃত্ব বিকশিত হচ্ছে না। নতুন নেতৃত্বের বিকাশ না হওয়ায় জেলাব্যাপী সংগঠনের কার্যক্রম স্থবির হয়ে পড়েছে। চরম স্বোচ্ছারিতার মাধ্যমে নেতৃত্ব আগলে রেখেছেন নরসিংদী জেলা পূজা উদযাপন কমিটির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক। তাদের বিরুদ্ধে বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদের গঠনতন্ত্র লংঘনসহ নানা অভিযোগ রয়েছে কমিটির সদস্যদের।
জেলা পূজা উদযাপন পরিষদের সদস্যরা জানান, প্রায় ৪ বছর পূর্বে সম্মেলনের মাধ্যমে ৭১ সদস্য বিশিষ্ট ২ বৎসর মেয়াদী কার্যকরী কমিটি গঠিত হয়। এ কমিটির সভাপতি নির্বাচিত হন জেলা দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটির সভাপতি প্রফেসর সুর্যকান্ত দাস এবং সাধারণ সম্পাদক দীপক কুমার সাহা। তাদের নেতৃত্বাধীন নরসিংদী পূজা উদযাপন পরিষদের কার্যকরী কমিটির মেয়াদ শেষ হয় প্রায় ২ বছর পূর্বে। নতুন নেতৃত্ব বিকাশে জেলা, উপজেলা, ইউনিয়ন কমিটিগুলো পুন:গঠনের প্রয়োজন রয়েছে। মেয়াদ অতিক্রান্ত হওয়া সত্বেও একটি কমিটিও পুন:গঠন হয়নি। কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দের নির্দেশ ও গঠনতন্ত্রের বিধান মানছেন না।
এ ব্যাপারে বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদের সাধারণ সম্পাদক জানান, নরসিংদী জেলা পূজা উদযাপন পরিষদের মেয়াদ উত্তীর্ণ হয়েছে। নতুন কমিটি গঠনের জন্য তাদের তাগাদা দেয়া হচ্ছে।
নরসিংদী জেলা পূজা উদযাপন পরিষদের মেয়াদ উত্তীর্ণ কমিটির সভাপতি প্রফেসর সূর্যকান্ত দাস জানান, কমিটির মেয়াদ ২ বছর পূর্ণ হতে আরো সময় বাকী আছে। কেন্দ্রীয় কমিটি গঠনের কাজ চলছে। কেন্দ্রীয় কমিটি গঠনের পর নরসিংদী জেলা কমিটির সম্মেলন অনুষ্ঠিত হবে।
নরসিংদী প্রেসক্লাবের সভাপতি ও নরসিংদী পূজা উদযাপন পরিষদের সহ-সভাপতি মাখন দাস জানান, বর্তমান কমিটির মেয়াদ অনেক আগেই উত্তীর্ণ হয়েছে। নতুন কমিটির জন্য সম্মেলন করতে হবে। কখন সম্মেলন হবে এ ব্যাপারে তিনি জানাতে পারেননি।
বিগত সম্মেলনে নরসিংদী পূজা উদযাপন পরিষদের সাধারণ সম্পাদক পদপ্রার্থী শ্যামল কুমার সাহা জানান, বর্তমান কমিটির মেয়াদ পার হয়ে আরো ১ বছরের অধিক সময় অতিক্রান্ত হয়েছে। তারা স্বে”ছাচারিতার মাধ্যমে পদে রয়েছেন। নতুন কমিটি করছেন না। সম্মেলন দিচ্ছে না। গত ৩/৪ মাস পূর্বে কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক নরসিংদী এসেছিলেন। তিনি জেলা কমিটির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদককে সম্মেলনের মাধ্যমে নতুন কমিটি গঠন করার ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ দিয়েছেন।
জেলা পূজা উদযাপন পরিষদের সাবেক সভাপতি ও বর্তমান কমিটির উপদেষ্টা অধ্যক্ষ অহিভূষণ চক্রবর্তী বলেন, কমিটির প্রায় ৪ বছর হয়ে গেছে, তারা সম্মেলন দিচ্ছেনা। স্বেচ্ছাচারিতার মাধ্যমে চালাচ্ছে। কেন্দ্রীয় কমিটিকে বিষয়টি অবহিত করা হয়েছে।
জেলা পূজা উদযাপন পরিষদের সাবেক সভাপতি ও কেন্দ্রীয় শিক্ষক নেতা রঞ্জিত কুমার সাহা জানান, কেন্দ্রীয় পূজা উদযাপন পরিষদের গঠনতন্ত্র অনুযায়ী জেলা উপজেলা, ইউনিয়ন কমিটি গঠিত হয়। গঠনতন্ত্র অনুযায়ী সকল কমিটির মেয়াদ ২ বৎসর। নরসিংদী জেলা কমিটির মেয়াদ অনেক আগেই শেষ হয়েছে। এটা মেয়াদ উত্তীর্ণ কমিটি।
হাজীপুর ইউপির সাবেক প্যানেল চেয়ারম্যান ও হাজীপুর গোপাল জিউর আখড়ার সহ সভাপতি সুজিত সূত্রধর জানান, জেলা পূজা উদযাপন পরিষদের সভাপতি সূর্যকান্ত দাস নরসিংদী জেলা দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটির সভাপতি। তিনি নরসিংদী জেলার একটি দুর্নীতির বিরুদ্ধেও সো”চার হতে পেরেছেন কিনা তা নিয়ে আমার সন্দেহ আছে। আমি একাধিক দুর্নীতির অভিযোগ সভাপতির নিকট দিয়েছি কিন্ত ঘটনার শতভাগ সত্যতা থাকা সত্বেও তিনি কোনপ্রকার ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারেননি। তিনি নিজেই দুর্নীতির পক্ষে সাফাই গেয়ে থাকেন। তিনি দুর্নীতির মাধ্যমে মেয়াদোত্তীর্ণ হওয়া সত্বেও নরসিংদী জেলা পূজা উদযাপন পরিষদের সভাপতির পদ দখলে রেখেছেন। এটাওতো বড় দুর্নীতি। নিজেকে নির্দোষ প্রমান করতে পূজা উদ্যাপন পরিষদের পদ থেকে ও জেলা দুর্ণীতি প্রতিরোধ কমিটির সভাপতির পদ থেকে তার সরে যাওয়া উচিত।
১৯৮২ সালে বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদ গঠিত হয়। বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদের গঠনতন্ত্রের ধারা ১১ এর দফা ‘খ’ তে উল্লেখ রয়েছে, “কমিটি সমূহের মেয়াদকাল সম্মেলনের মাধ্যমে কমিটি গঠনের তারিখ হইতে ২ বৎসর। কমিটির মেয়াদ ২ বছর শেষ হইবার ৯০ দিন পূর্ব হইতে দ্বি-বার্ষিক সম্মেলন অনুষ্ঠানের প্রস্ততি গ্রহণপূর্বক মেয়াদ উত্তীর্ণ হওয়ার পূর্বেই সম্মেলন সমাপ্ত করিতে হইবে। মেয়াদ উত্তীর্ণ কমিটি সমূহ অকার্যকর কমিটি হিসেবে বিবেচিত হইবে। মেয়াদ উত্তীর্ণ হওয়ার পর দ্রুত আহ্বায়ক কমিটি গঠনপূর্বক সম্মেলনের মাধ্যমে অনতিবিলম্বে পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠন করিতে হইবে।”
নেতৃবৃন্দ জানায়, বর্তমান নরসিংদী জেলা পূজা উদযাপন পরিষদের কমিটি অকার্যকর। গঠনতন্ত্র অনুযায়ী তাদের নতুন কমিটির জন্য সম্মেলন করার অধিকার নেই। আহ্বায়ক কমিটি গঠন করে সম্মেলনের মাধ্যমে নতুন নেতৃত্ব নির্বাচন করতে হবে। এ ক্ষেত্রে জেলা আহবায়ক কমিটির অধীনে উপজেলা ও পৌর কমিটি নতুন কমিটি গঠণ করে ৯০ দিনের মধ্যে সম্মেলনের মাধ্যমে জেলা পূজা উদ্যাপন পরিষদের কমিটি গঠন করতে হবে। সভাপতি সূর্যকান্ত দাস সম্পর্কে মন্তব্য করতে গিয়ে তারা বলেন, তিনি একজন শিক্ষিত ব্যক্তি। জেলা দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটির সভাপতি। তার এ আচরণ কাম্য নয়। তার বক্তব্য সঠিক নয়। নতুন কমিটি যথাসময়ে গঠন না করে জেলা পূজা উদযাপন পরিষদের পদে থাকা দুর্নীতির সামিল। তিনি গঠনতন্ত্র মানছেন না। কমিটি অকার্যকর হওয়ায় তিনি সভাপতি পরিচয় দিতে পারেন না। অথচ সভাপতি ও তার সাধারণ সম্পাদক পদগুলো ব্যবহার করে যাচ্ছেন। বিভিন্ন স্থানে বিলবোর্ড স্থাপন করে নিজেদের হাইলাইট করে যাচ্ছেন।
এ ব্যাপারে নরসিংদী জেলা পূজা উদযাপন পরিষদের মেয়াদ উত্তীর্ণ কমিটির সাধারণ সম্পাদক দীপক কুমার সাহার সাথে ফোনে যোগাযোগ করতে বারবার চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
একাধিক গণমাধ্যমে এ ব্যপারে সংবাদ প্রকাশ হওয়ার পর দীপক সাহা দৈনিক নরসিংদীর বাণীর সম্পাদককে অকথ্য ভাষায় গালাগালসহ প্রাণ নাশের হুমকী দিয়েছে। হুমকীর প্রেক্ষিতে দীপক সাহার বিরুদ্ধে নরসিংদী সদর মডেল থানায় একটি জিডি করা হয়েছে। হুমকীর ঘটনায় নিন্দা জানিয়েছেন জেলার বিভিন্ন সাংবাদিক সংঘঠনের নেতৃবৃন্দ, রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বসহ জনপ্রতিনিধি, সামাজের বিভিন্ন স্তরের গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button