কৃষিজাতীয়স্বাস্থ্যকথা

ভোক্তাগণ সাবধান! নাজিরশাইল, মিনিকেটে স্বাস্থ্য ঝুকি বাড়াচ্ছে

শেয়ার করুনঃ

The Daily Narsingdir Bani

বাণী ডেস্ক : বাংলাদেশের বাজারের চালের প্রায় ৮০ শতাংশ আসে বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (ব্রি) প্রবর্তিত কোনো না কোনো জাতের ধান থেকে। দেশে বোরো ও আমন মৌসুমে ব্যাপকভাবে চাষ হয় ব্রি ২৮ ও ব্রি ২৯ ধান। কিন্তু চালের বাজারে ব্রির নেই বললেও চলে। চাল রূপান্তরের সঙ্গে সঙ্গে উধাও হয়ে যায় আসল পরিচয়। দেশের সব বাজার সয়লাব বিভিন্ন মানের মিনিকেট ও নাজিরশাইল চালে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাস্তবে মিনিকেট নামে ধানের কোনো জাত নেই। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে ব্রি ২৮ এবং কিছু ক্ষেত্রে ব্রি ২৯ ধান মাত্রাতিরিক্ত ছাঁটাই করে এবং চাল বারবার কেটে মিনিকেট নামে বাজারজাত করা হয়। একইভাবে ব্রি ২৯ ধান অধিক ছাঁটাই ও পলিশ করে চালের নাম দেওয়া হয় নাজিরশাইল।

বিশেষজ্ঞদের মতে, টাকা খরচ করে এসব চাল খেয়ে মানুষ শরীরের জন্য বিপদ ডেকে আনছে। সেই সঙ্গে প্রতারিত হচ্ছে প্রতিনিয়ত। স্বাভাবিক মাত্রার চেয়ে অধিক ছাঁটাই করা ওই সব চাল কার্বোহাইড্রেট বা শর্করায় ভরা। চালের উপরিভাগের পুষ্টিগুণ কিছুই থাকে না। সেই সঙ্গে কম দামি মোটা চাল কেটে ছেঁটে দ্বিগুণ দামে বিক্রির ফলে ভোক্তারা আর্থিকভাবেও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। আর শুধু শর্করা খাওয়ার ফলে ডায়াবেটিসসহ নানা ধরনের রোগ সৃষ্টি হচ্ছে মানব দেহে।

ব্রির ফলিত গবেষণা বিভাগের সিএসও ড. মো. আতিকুল ইসলাম সহজ ভাষায় বলেন, ‘ধানের মাঠ আর ধানের বাজার ব্রি ধানে ভরপুর। চালের বাজারে গিয়ে আর ব্রি চাল পাই না। যারা ভোক্তা তারাও খুঁজে দেখে না ব্রি ধান কোথায় গেল আর মিনিকেট নাজিরশাইল নামের যে চাল খাই তা কোথা থেকে এলো। মিনিকেট নামে কোনো ধান তো নেই। তাহলে চাল এলো কিভাবে? কোথায় পরিচয় পাল্টে যায়? কোথায় চালের এমন কারসাজি ঘটে সেটা কেউ খুঁজে দেখে না। এই সুযোগ নিয়েই মিলারদের বড় একটি অংশ দেশের ৮০ শতাংশ ব্রি ধানের অপেক্ষাকৃত মোটা চাল কেটে চিকন বানিয়ে ফেলে শুধু অধিক মুনাফার আশায়।’
ওই বিশেষজ্ঞ বলেন, ‘এক কেজি মোটা চাল ৩০-৩৫ টাকায় পাওয়া যায়। সেই একই চাল মিলাররা কেটে দ্বিগুণ দামে ভিন্ন পরিচয়ে বাজারে ছাড়ে। কাটা-
ছাঁটায় হয়তো কেজিপ্রতি এক-দেড় টাকা খরচ হয়, কিন্তু বাজারে মানুষ তা কিনে খায় ৫০ থেকে ৭০-৭৫ টাকা কেজিতে। ধান চাল নিয়ে যারা কাজ করে তারা সবাই কিন্তু বিষয়টি জানে। এর পরও এর কোনো প্রতিকার নেই, প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেই, যা খুবই দুঃখজনক।’

ব্রির পুষ্টি ও শস্যমান বিভাগের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মোহাম্মদ আলী সিদ্দিকী বলেন, ‘চালের সর্বোচ্চ ১০ শতাংশ পর্যন্ত ছাঁটাই করা হচ্ছে স্বাভাবিক বা সহনীয় মাত্রা। এর বেশি হলেই তা পুষ্টি ও উপকারী খনিজ মান হারিয়ে ফেলে। কারণ চালের উপরিভাগেই এগুলো থাকে। বাকিটা থাকে কার্বোহাইড্রেট। কিন্তু আমরা দেখেছি, আমাদের দেশে ২৭-২৮ শতাংশ পর্যন্ত কেটে ফেলা হয় চিকন ও স্বচ্ছ করতে। ফলে মানুষ যে ভাত খাচ্ছে সেটা শুধুই কার্বোহাইড্রেট খাওয়া হচ্ছে। সেখানে ব্যালান্স থাকছে না। ফলে ডায়াবেটিস, স্থূলতাসহ অন্যান্য রোগের ঝুঁকি বাড়ে।’

একজন কৃষিবিদ বলেন, ‘প্রথমেই ঘর্ষণের মাধ্যমে ধানের বাইরের খসখসে হাস্ক বা খোসাটিকে আলাদা করে পরবর্তী সময়ে সরিয়ে ফেলা হয়। এর ওজন ধানের ওজনের প্রায় ২০ শতাংশ। এরপর বাদামি চাল চিকন ও চকচকে সাদা করতে ব্যবহার করা হয় হোয়াইটেনার ও পলিশার নামের দুটি যন্ত্র। সেখানেও মূলত ঘর্ষণকে কাজে লাগিয়ে চালের বাইরের বাদামি রঙের আবরণটি এমনভাবে সরিয়ে ফেলা হয়, যাতে চাল অনেকটাই চিকন হয়ে যায়। এতে সম্পূর্ণ দূর হয়ে যায় ব্রান অর্থাৎ ফলত্বক, বীজত্বক ও ভ্রূণ। এই দূর হওয়া অংশের ওজন মূল চালের ৮ থেকে ১০ শতাংশ। সাদা চাল দেখতে সুন্দর, চকচকে, ভাত খেতে মজা, আর চাল টেকেও বেশি দিন। বাদামি চালে যে ফসফরাস থাকে, সেটি শরীরে জিংক গ্রহণে বাধা দেয়। চালকে সাদা ও চিকন করার ফলে আমরা গুরুত্বপূর্ণ প্রোটিন, ফ্যাট, ভিটামিন, খনিজ ও আঁশ হারাচ্ছি। আঁশের পরিমাণ কম থাকায় পরিপাকে খুব তাড়াতাড়ি শর্করা ভেঙে উৎপন্ন চিনি রক্তে চলে যায়। এ কারণে সাদা চালের গ্লাইসেমিক ইনডেক্স অনেক ওপরে। গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে, সাদা চাল গ্রহণ টাইপ ২ ডায়াবেটিসের ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়।’

ব্রির কৃষি অর্থনীতি বিভাগের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মো. আবুবকর সিদ্দিক বলেন, ‘দেশে আমাদের ব্রির প্রায় ১০০ ভ্যারাইটির ধান উৎপাদন হয়। কিন্তু বাজারে গেলে ওই ধানের কোনো চাল পাওয়া যায় না। কোথায় যায় তা সাধারণ মানুষ জানে না বা জানার আগ্রহও দেখা যায় না। বরং তারা সবাই চিকন চালের প্রতি আসক্ত হয়ে পড়ে, যা সাধারণত মিনিকেট বা নাজিরশাইল নামে এখন বেশি প্রচলিত। অথচ এই জাতের কোনো ধান নেই। সবই হচ্ছে ব্রি ধানের বিভিন্ন ভ্যারাইটির চাল। এ ক্ষেত্রে আসল চাল অতিরিক্ত ছাঁটাই করে ও কেটে রূপ-রং পাল্টে ফেলে পলিশ করে চিকন বানিয়ে ফেলা হয়।’

ওই বিশেষজ্ঞ বলেন, ‘দেশে আউশ, আমন ও বোরো ধান উৎপাদন হয়। এর মধ্যে ৫৫ শতাংশ থাকে বোরো বা ব্রি জাতের। আর এই ব্রির মধ্যে ২৮ ও ২৯ জাতের ধান উৎপাদন হয় সবচেয়ে বেশি। কিন্তু আমরা কোথাও কাউকে ব্রি চাল বলতেও শুনি না, কিনতে বা বেচতেও দেখি না।’ তিনি বলেন, ‘চাল নিয়ে এমন কারসাজি ও প্রতারণা রোধে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। নয়তো একদিকে বাজারে অস্থিরতা বাড়ার সুযোগ তৈরি হয়, অন্যদিকে পুষ্টিমান খর্বকৃত এসব চাল জনস্বাস্থ্যের জন্য হুমকি হয়ে উঠছে। সেই সঙ্গে দেশে ধানের যে নিজস্ব উদ্ভাবনী একের পরে এক যা তৈরি হচ্ছে তার স্বকীয়তা হারিয়ে যাচ্ছে। এমনটা চললে একসময় দেশের ধান গবেষণা ও উৎপাদন প্রক্রিয়ায় বড় ধরনের বিপত্তি দেখা দিতে পারে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button